সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৩ই ফাল্গুন ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
২৫ জানুয়ারী ২০২১ ১২:১৯

আপডেট:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:১৯

ছবিঃ অমর মিত্র

 

পরমান্ন বেঁধেছিল মা রেবা। সেই পরমান্নর সুবাস ঘর-আঙিনায় ছড়িয়ে গেল। দুয়ার বন্ধ বলে সখা তা টেরও পেল না। মায়ের হাতের পরমান্ন তার অতি প্রিয় ছিল। মা ডাকল কতবার, কতবার। ডাকল গন্ধবতী। সে দুয়ার খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল না। চৈত্র পূর্ণিমা। মা বলল, কামদেবের মন্দিরে পুজো দিয়ে আয়, বুড়ি পার্বতী যাবে সঙ্গে।

মা বোধহয় আগেই ভেবে রেখেছিল মেয়েকে পাঠাবে কামদেবের মন্দিরে। আর গন্ধবতীর মনেও তো বাসনা ছিল দেখে আসে কামদেবের রূপ। কামদেব আর রতি দেবীর কথা শুনেছিল সে মায়ের কাছে। শুনেছিল কামদেব কীভাবে ভস্ম হয়েছিলেন মহাদেবের রোষে। সেই শাপ থেকে মুক্ত হন কীভাবে কামদেব মর্ত্যলোকে জন্ম নিয়ে। রতিদেবীও স্বামীর উদ্ধারের জন্য জন্ম নিয়েছিলেন মর্ত্যে।

পার্বতী বুড়ি কুটনি। প্রাচীনা। বহুকালের বৈধব্য নিয়ে বুড়ি যেন ত্রিকালদর্শী। দেখেছে যেন এই সসাগরা পৃথিবীর সব। স্থলভাগ, জলভাগ। কী না জানে বুড়ি। অকালবৈধব্য নিয়ে জীবন কাটাল কিন্তু পুরুষ মানুষ সম্পর্কে তার কথাই যেন শেষ কথা। বুড়ি কামদেবের মন্দিরে কতবার গেছে। শরীরে। রঙ নেই, মনেও নেই, তবুও যায়। কামদেবকে দেখে তার আনন্দ হয়। মনে রং ফেরে। বুড়ি বলে, চৈতী পূর্ণিমায় নারী-পুরুষের মিলনের কত লক্ষণই না দেখা যায় কামদেবের মন্দিরে। তা দেখেও সুখ। এ জন্মে আমি রতির মতো দিন কাটালেম, পরজন্মে মর্ত্যে জন্ম নেব মায়াবতী হয়ে, ভস্ম হওয়া স্বামীকেও পাব সেখেনে, কৃষ্ণপুত্র প্রদ্যুম্ন হয়ে জন্ম নেবেন তিনি—হা কপাল! যার কেউ নেই তার কামদেব আছেন। কামদেবই তার সাধপূরণ করেন--।

কুটনি বুড়ি হাত ধরে গন্ধবতীর, ধ্রুবপুত্র তো গণিকায় মজেছে।

চমকে উঠেছে গন্ধবতী। মুখখানি কালো হয়ে গেছে দুঃখে। একথাও সব মানুষ জেনেছে। সব প্রাণী জেনেছে। ময়ূর, কবুতর, চকোর, চকোরী, চাতক, টিয়া, টিট্টিভ সব পাখি জেনেছে। জেনেছে বনের হরিণ। ধবলী গাইটি। জেনেছে গম্ভীরা নদী, নদীতীরের বেতসবন, বালুকাময় নদীর বুক, গাছ-গাছালি যত। জেনেছে আকাশ, মাটি, রৌদ্র, বাতাস, সব। এই যে কামদেবের মন্দিরে গন্ধবতী চলেছে বুড়ি পার্বতীর হাত ধরে, পথে শুধু পত্র ঝরণের শব্দ, গাছের পাতাগুলি ঝরে ঝরে যাচ্ছে শুধু এই দুঃখে যে ধ্রুবপুত্র গণিকায় মত্ত হয়ে ভুলেছে গম্ভীরার মেয়েকে আর গম্ভীরার মেয়ে যাচ্ছে কামদেবের মন্দিরে পূজার ডালি নিয়ে ম্লানমুখে। তার মুখের ছায়া পড়েছে হাতের ডালিতে ধরা অশোক ফুলে। ফুল কালো হয়ে যাচ্ছে  যেমন হয়েছে তার মুখখানি, রক্তাভ অধরখানি। সমস্ত রাত অনিদ্রায় গেছে তার, সেই ছায়া চোখের দু’কোলে। এই শ্যামরেখা আর প্রিয় সান্নিধ্যে নিদ্রাহীনতার শ্যামরেখায় দুস্তর তফাৎ। চোখ দুটি যেন গহ্বরে প্রবিষ্ট হয়েছে। কৃশ হয়েছে কন্যা। শরীর হয়েছে অনার্দ্র, নীরস তরু। মনে যে সুখ নেই তাকে দেখলে তা ধরা যায়। মনের ছায়া তার সর্ব অঙ্গে ফুটে উঠেছে।

বুড়ি পার্বতী জিজ্ঞেস করে, গণিকা নাকি তাকে অপমান করে তাড়িয়ে দিয়েছে?

গন্ধবতীর মুখ অন্ধকার। একথা কেন তুলছে বুড়ি দাদি। এসবের সে কী জানে? বুড়ি কি জানেনা সখার জন্য দিবারাত্র তার মন পোড়ে। বুড়ি বলছে, কুকুর বেড়ালের মতো তাকে নাকি তাড়িয়েছে গণিকা দেবদত্তা, চোরের মার খেয়েছিল বেটা।

জানিনে দাদিমা, যা রটে তার অনেকটাই রটনা। বলে গন্ধবতী।

বুড়ি তার দন্তহীন মুখে হাসে, বলে, যা রটে তার অনেকটাই ঘটে, উল্টো বলিস কেন, বেটা ছেলে তো গণিকা ঘরে যাবে, তার উপর আবার ধ্রুবদাসের বেটার বিয়ে হয়নি, মেয়েমানুষ কেমন তা জানে না, কিন্তু শরীর তো জানতে চাইবে, তখন গণিকা ছাড়া কে জানাবে সব, গণিকা আছে বলে গেরস্তর ঘর নিশ্চিন্ত আছে, নইলে আইবুড়ো, সধবা বিধবা সবাইকে ধরে টানত পুরুষগুলো।

থাক দাদিমা, এসব শুনে কী হবে?

বুড়ি বলে, যাচ্ছিস কামদেবের মন্দিরে, বড় হলি এখন, তুই তো জানবি সব, সংসার হবে, স্বামীকে বশ করে রাখার উপায়, ছলচাতুরি তো জানতে হবে, না যদি জানিস তো সে পুরুষমানুষ গণিকার ঘরে গে পড়ে থাকবে, গণিকার পায়ে সব দেবে।

কেঁপে ওঠে গন্ধবতী। নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকায়। শূন্য নীলিমায় চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ছলছল করে ওঠে চোখের নদী। ধ্রুবপুত্র তার সখা, সে ধ্রুবপুত্রের সখী। সখী তো জানেনা কীভাবে সখাকে বেঁধে রাখবে মনের ভিতরে। সে যা জানে, সব তো ওই সখার কাছেই জানা। বুড়ি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলে, ওরে মেয়ে, আর কেন এবার যে কোনো উপায়ে চার হাত এক করে দিক তোর মা, তোর এই যৌবনের রূপ যদি না দেখল তো......।

দাদিমা, তুমি থামো।

হি হি করে হাসে বুড়ি পার্বতী, এই আমার বুক দ্যাখ, ছিল ওই তোর মতো, ওই রকম পূর্ণচন্দ্র। যৌবন থাকে না চিরকাল, যতক্ষণ আছে পুরুষমানুষও আছে সঙ্গে, ভেড়া হয়ে থাকবে, তোর পায়ের কাছে লুটোবে, শোন মেয়ে, না হলো বিয়ে, সে কি তোকে ভালবাসেনি?

দাদিমা! দু চোখ দিয়ে দুই ধারা জল বয়ে যায়। গন্ধবতী নদী দুভাগ হয়ে দুদিকে বয়ে যায় যেন। বুড়ি পার্বতী তার কানে কানে বলে, পুরুষ মানুষ বশ করার ছল-চাতুরির কথা।  যৌবন যার এত সুন্দর, বসন্ত যাকে ঘিরে ধরেছে এভাবে, তার কাছ থেকে ভ্রমর অন্য কোথাও চলে যাবে কেন? ও মেয়ে,  এই তো ভোগের সময়, যদি সে তোকে ভোগ না করতে পারে, যাবেই তো ছেড়ে, শোন মেয়ে, গণিকারা জানে অনেক কিছু, কত বিদ্যাই না জানে তারা। নৃত্য জানে, সঙ্গীত জানে, বীণা বাজায় তারা, শয্যা রচনা, পুষ্পচয়ন, পুষ্পসজ্জা, সূচীকার্য করে কী সুন্দর, দেহ সাজায় কী মধুর করে, চৌষট্টিকলায় পটিয়সী। গণিকার সঙ্গে পারবে কেন গৃহবাসীর মেয়ে, কিন্তু গৃহবাসীর যা আছে তা তো গণিকার নেই মা, ভয় পাসনে।

গন্ধবতী বলেছে, ভয় আমি কেন পাব, তুমি অন্য কথা বল দাদিমা।

বুড়ি পার্বতী তার গায়ে হাত দেয়। আচমকা তার বুকে হাত দেয়! কী ভয়ানক সেই ছোঁয়া। গা গুলিয়ে ওঠে যেন মেয়ের। গায়ে যেন সরীসৃপ হেঁটে যাচ্ছে এমন ছিল সেই অনুভূতি। বুড়ি তার কোমল স্তন পিষ্ট করে নিতম্বে তার লোলচৰ্মাবৃত হাত স্থাপন করে বলে, এমন যার যৌবন, এমন ফুলের মতো যে বসন্ত, তার কেন মুখ অন্ধকার হবে রে মেয়ে, গণিকারও যৌবন থাকে, কিন্তু সে যৌবন শতভ্রমরের হুল বেঁধানো, তার মধু দশরকম ভ্রমর এসে পান করে যায়, আর গৃহবাসীর যৌবন তো শুধুই সেই পুরুষের জন্য, তুমি হবে তার ভাৰ্য্যা, তোমার ভরণপোষণের ভার তার উপর, তুমি শুধু তাকে খুশি করবে তোমার রূপ দিয়ে। এমন মধুর যৌবন তার, তার দয়িত কিনা গেল গণিকার ঘরে, আবার কোন গণিকা, না দেবদত্তা, কোন দেবদত্তা, যে কিনা রাজভোগ্যা, নগর শ্রেষ্ঠী সুভগ দত্তর ভোগ্যা, সুভগ দত্ত বলে সেই গণিকার জন্য রথভর্তি অলঙ্কার নিয়ে যায়, সোনায় মুড়ে দেয় তাকে। অত সব ছেড়ে ধ্রুবদাসের বেটার কথায় মত্ত হবে কেন সে, কানাকড়িও ওর কাছে আছে বলে মনে হয় না। গণিকার খাঁই  মেটানর সাধ্য ছিল কি তার, ছিল না। তাই অপমানিত হয়েছে।

গন্ধবতী অনুভব করে রোদ ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। তাপ বাড়ছে। তার শরীরের অনাবৃত অংশগুলিতে যেন আগুনের ছোঁয়া লাগছিল। দু’পাশের গোধূম ক্ষেত্র প্রায় শূন্য, শস্য কর্তন শেষ হয়ে যাওয়ার মুখে। শস্যক্ষেত্রে দু’চারজন কৃষক। কালোমাটি শুষে নিচ্ছিল যেন চারপাশের আলো। পাত ঝরছিল পথের ধারের গাছগুলির। ঝরছিল তো ঝরছিলই। চারদিকে পাতা ঝরার শব্দ গভীর হয়ে তার  সত্তাকে ঘিরে ধরছিল যেন। বুড়ি আবার গণিকার সঙ্গে তার তুলনা করছিল। গণিকা কী পারে সেই কথা বলছিল বুড়ি। দরকারে তাকে নিয়ে যাবে সেই গণিকার কাছে। গণিকা দেবদত্তার কাছে নিয়ে গিয়ে  এমন গুপ্তবিদ্যা শিখিয়ে আনবে যে ধ্রুবপুত্র তাকে ঘিরে থাকবে সমস্ত জীবন। পুরুষকে বশে রাখার কতরকম বিদ্যা যে আছে, ঘরের মেয়েমানুষ তা আয়ত্ত করতে পারে না বলে পুরুষমানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে যায়। বুড়ি বলছিল, সে দেখেছে গণিকা দেবদত্তাকে। এক শ্রাবণী পূর্ণিমায় মহাকাল মন্দিরে। গিয়েছিল সে। বুড়ি বর্ণনা দিচ্ছিল গণিকার রূপের। সাক্ষাৎ রতিদেবী যেন দেবদত্তা। তার রূপ কামদেবের পত্নীরই রূপ যেন বা। যেমন তার মুখখানি, তেমন তার চোখদুটি। তার মা রসমঞ্জরীকেও দেখেছিল বুড়ি পার্বতী অনেককাল আগে। রসমঞ্জরীর রূপে যত আগুন ছিল, এর আগুন যেন আরো বেশি। ওই আগুনে তো উজ্জয়িনীর বহু পুরুষ ঝলসেছে। ধ্রুবপুত্র না হয় সেভাবেই ঝলসে পুড়ল। কিন্তু দেবদত্তা তো শুধু কামনার আধার নয়, অশেষ গুণবতী। শোন মেয়ে, গণিকা যা শেখাবে প্রিয় মিলনের কৌশল তা আর কেউ পারবেনা।

ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে গন্ধবতী, এসব বলছ কেন, আমি তার বাল্যসখী, সে আমার বাল্যসখা, সখা আজ ফিরেছে ঘরে।

সে তো দেখেই এলাম, দোর বন্ধ করে বসে আছে বেটা, শোন মেয়ে কামদেবের কাছে প্রাণভরে যাঞা কর, মনের মানুষ ঠিক ফিরে আসবে তোর কাছে।

গন্ধবতী নিশ্চুপ। সে নিজেই যেন জানে না, যাচ্ছে কেন কামদেবের মন্দিরে। সখাকে নিজের অধিকারে আনার জন্য কি? মাথা নামিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে যাচ্ছিল সে।

বুড়ি নিজের মনে বকতে বকতে হাঁটে, যে পুরুষ ঘরে সুখ পায় না সেই তো যায় গণিকার কাছে, আর গণিকা তাকে যা দেয় তা ঘরের বউ কি দিতে পারে, গেরস্ত ঘরের মেয়েমানুষ কি দিতে পারে? গণিকার কটাক্ষ, গণিকার মদিরতা যে একবার দেখেছে কামদেবের আশীর্বাদ ভিন্ন তাকে ফেরানোই কঠিন। তাকে যদি বশীভূত করে কামদেব ঘরের মেয়েমানুষের কাছে ফিরিয়ে দেন তবে সে ফেরে, তোর মা আমাকে সব বলেছে, তুই প্রাণভরে ডাক কন্দর্প ঠাকুরকে।

মা কী বলেছে? গন্ধবতী জিজ্ঞেস করতে গিয়েও থেমে যায়। কিন্তু তার মনের ভাবটি যেন টের পায় বুড়ি পার্বতী, বলল, তোর মা বলেছে তুই ওর কাছে সমর্পণ করেছিস নিজেকে, শয়নে, স্বপনে ধুবোপুত্তুর।

গন্ধবতীর সমস্ত শরীরে জ্বালা ধরে যাচ্ছিল। সে জানে না সখার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছে কি না,  তবে সখার মুখ দেখলে প্রাণে শান্তি আসে, শরীর মন স্নিগ্ধ হয়। সখাকে কোনোদিন মুখ ফুটে তো কিছু বলেনি। বুড়ি পার্বতীর কথায় তবু সে প্রতিবাদ করতে পারে না। বুড়ির হাত তার কোমরে, বুড়ি বলছে, এমন যৈবন, চাঁদের মতো মুখখানি, ফুলের মতো দেহখানি, এমন সুগন্ধ যে দেহে, এমন সুধারস যার  কথায়, তাকে ছেড়ে যে পুরুষ গণিকার ঘরে যায় তাকে ধিক।

রোদ পোড়াচ্ছিল গন্ধবতীকে। চৈত্রমাস শেষ হয়ে এল প্রায়। কালোমাটি শুষে নিচ্ছে পৃথিবী সব সুষমা। রোদে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর সব রস, বসন্তের ফুল ঝরে ঝরে কালো হয়ে যাচ্ছে রোদে। পথে একটি বকুল গাছের ছায়ায় বসল দু’জনে। বকুল ফুলে ছেয়ে আছে বৃক্ষতল। বকুলের গন্ধ বাতাসে গাঢ় হয়ে আছে। প্রকৃতি সুগন্ধময়। প্রকৃতি পুষ্পগন্ধবতী। বাতাসে উড়ছিল কালো ধুলো। সামনে যে পথ চলে গেছে সেইদিকেই দূরে কোথাও কামদেবের মন্দির। মন্দির ছাড়িয়ে শিপ্রা নদী। নগরের মানুষ শিপ্রার কুল ধরেই আসে কামদেবের মন্দিরে।

তাম্ৰধ্বজ শুনছিল গন্ধবতীর কথা। গন্ধবতী বলছিল, বুড়ি পার্বতী যত বলে তাকে ধিক যে যায় গণিকার ঘরে, সে তত যেন বিরহ-আকুল হয়ে উঠছিল ধ্রুবপুত্রর জন্য। গন্ধবতী কতদিন বসে আছে কথাগুলি শোনাবার জন্য। তার কথাটি শুনবে কে? শোনাতে পারলে তার এই বিরহের কষ্ট যেন কমে। সেই যে চৈত্রদিনে তার শরীরের ভিতরে রোদ ঢুকেছে, তাপ ঢুকেছে জ্বলন্ত পৃথিবীর, তা যেন নিঃশেষ হয়নি এখনো। কী রোদ আর কী রোদ! পুড়ে যায় যেন সর্ব অঙ্গ! সেই যে জ্বলন আরম্ভ হলো চৈতি পূর্ণিমায়, শরীর জ্বলেই যাচ্ছে।   

তাম্ৰধ্বজ বলল, তুমি বলে যাও, ধ্রুবপুত্রের সন্ধান মিলবে এর ভিতরেই।

গন্ধবতী বিড়বিড় করে, বুড়ি দাদি যতই বলুক, ধ্রুবপুত্র অতি শুদ্ধ পুরুষ, শুদ্ধ মনের মানুষ, জ্ঞানী কখনো অশুদ্ধ মনের মানুষ হয় না....।

তা শুনে খিলখিল করে হাসে বুড়ি! কে বলেছে সে অশুদ্ধ, অপবিত্র! পুরুষমানুষ কোনোকালে অশুদ্ধ হয় না, পুরুষমানুষের সর্ববিষয়ে অধিকার, সর্বনারীতে অধিকার, ভোগের অধিকার, সে গণিকার কাছে গেল না পরস্ত্রীর কাছে গেল তা নিয়ে ভাবে না কেউ, অশুদ্ধ হয় মেয়েমানুষ! মেয়েমানুষ কুলটা হলেই সব্বোনাশ, তখন সে বারনারী, তাকে ভোগে সবার অধিকার, মেয়েমানুষকে সর্বকুল রক্ষা করে চলতে হয়।

তাম্ৰধ্বজ বলে, কথাটা তো এই সমাজে  অসত্য নয়, এই রকমই তো হয়ে থাকে।

গন্ধবতী ফিসফিস করে, এমন ভাবেই বলত সে, এভাবেই ভাবত সে।

তাম্ৰধ্বজ বলে, মানুষের তো কখনো কখনো বিভ্রম হয়।

হয় বোধহয়। অস্ফুট গলায় বলে গন্ধবতী।

তারপর কী হয়েছিল? জিজ্ঞেস করল তাম্ৰধ্বজ।

গন্ধবতীর শরীর ভেঙে যাচ্ছিল কান্নায়। শরীর ভেঙে কান্না বেরিয়ে আসছিল যেন। বুড়ি পার্বতী তাকে বোঝাচ্ছিল পুরুষমানুষ মানে সেই ধ্রুবপুত্রকে বশীকরণের প্রথম ধাপ হলো মদনোৎসবে যাওয়া। তখন নিজেকে ছোট লাগছিল। তার মনে হচ্ছিল কামদেবের মন্দিরে গিয়ে তার কাজ নেই। বাড়ি ফিরে দুয়ার খুলে বের করে আনে সখাকে। আবীরে রাঙিয়ে দেয় তাকে। ঝড়ে বিপর্যস্ত হয়েছে সখার মোহন রূপটি। নদীর জলে স্নান করিয়ে তাকে আবার স্নিগ্ধ করে তোলে। মনে পড়ল গন্ধবতীর। কতদিন আগের কথা তা, সে তখন বালিকামাত্র। ধ্রুবপুত্র এক সন্ধ্যায় তাকে চেনাতে শুরু করল আকাশ। উত্তর আকাশের জ্বলজ্বলে তারাটি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, তুমি চেন ওই তারাটিকে?

না তো!

ধ্রুব, ধ্রুবতারা।

গন্ধবতী আকাশে তাকিয়ে আছে অবাক হয়ে। তার সমস্ত গায়ে রোমাঞ্চ। ওই তারা থেকে জন্ম নাকি সখার? ধ্রুব তো সখার পিতা? পিতা তোমার ?

হ্যাঁ। আত্মগত সেই কণ্ঠস্বর যেন এখনো শোনা যায়, আমি যেন ওই নক্ষত্রেরই সন্তান, পিতা ওই নক্ষত্রেই আছেন, আমি যেন ওই নক্ষত্র থেকেই নেমেছিলাম গম্ভীরার কুলে, গন্ধবতী ওই তারা দেখে সমুদ্রের নাবিকরা দিশা খুঁজে পায়।

গন্ধবতী বলে, আমি তাকিয়েছিলাম তার চোখে, কী তার রূপ! 

ওই রূপেই তো মজলি তুই, না হলে কত রাজপুত্তুর তোকে নিতে পারে, উদ্ধব দাস রাজসভার লোক, রাজপুততুরের সঙ্গে তার তফাৎ কীই বা? সে তো এককথায় রাজি তোকে বে করতে। যদি বলিস তার সঙ্গে বে’ দিয়ে ওই বেটাকে জবাব দিই মুখের উপর, তুই কি রাজি? বুড়ি পার্বতী জিজ্ঞেস করেছিল আশা নিয়ে।

কী যে বল তুমি দাদিমা! ও কি মানুষ!

কার কথা বলিস, উদ্ধব?

গন্ধবতী চুপ করেছিল। বুড়ি তখন দু’হাতে বেড় দিয়েছিল তাকে, বলেছিল, জানি তুই একথা বলবি, ও বেটা কিনা আমাকে ধরেছে, যাক গে, তোর সখা তোরই থাক, কামদেবের কাছে প্রার্থনা কর, তিনি তোর সাধ পূরণ করবেন, একমাস পরে বৈশাখী পূর্ণিমা, ওইদিন না হয় চার হাত এক করা যাবে। তোর মা মনে মনে ঠিক করে রেখেছে ওই দিন তোর গলায় মঙ্গলসূত্র উঠবে, ধ্রুবপুরের হাতে তোকে দিয়ে নিশ্চিন্ত হবে।

এ সব তো কিছুই জানত না গন্ধবতী। সে অবাক হয়ে শুনছিল বুড়ির কথা। পাথর হয়ে বসেছিল। বুড়ি বলছিল চৈত্র পূর্ণিমা থেকে বৈশাখী পূর্ণিমা পর্যন্ত চোখে চোখে রাখতে ধ্রুবপুত্রকে। ও যেন গম্ভীরা না ছাড়ে, ও যেন নগরে না যায়। গণিকারা কুহকিনী। তারা ঘর পায়না, সংসার পায়না তাই সংসারের মানুষ টেনে নেয়। ঘর ভাঙে, সংসার ভাঙে। কুহকিনী এমন মায়ায় ভোলাবে যে বার বার তার কাছে ছুটে যাবে পুরুষমানুষ। পুরুষ মানুষকে বাঁধতে হলে ছলাকলা করতে হবে গণিকার মতো। রূপে ভোলাতে হবে তাকে। গন্ধবতীকেও হয়ে উঠতে হবে কুহকিনী।

শুনছিল গন্ধবতী। এলিয়ে পড়ছিল গরম বাতাসের ঘোরে। তার ভয় হচ্ছিল বুড়ির কথা শুনতে শুনতে। তারপর একসময় বুড়ি তাকে টেনে তোলে। দু’জনে আবার হাঁটে কামদেবের মন্দিরের দিকে। বুড়ি যে কী বলতে চাইছিল তা নিয়ে তার মনে ধন্ধ তৈরি হচ্ছিল। বুড়ি আবার গুণগান করছিল উদ্ধব দাসের। রাজসভার মানুষ তো ধ্রুবপুত্র নয়, বরং সে ধিকৃত হয়েছে উজ্জয়িনী নগরে। রাজগণিকার ধিক্কার তো রাজধিক্কারের চেয়ে অনেক বেশি অসম্মানের। ধ্রুবপুত্র কি কোনো কালে রাজসভায় স্থান পাবে? পাবে না যে সে বিষয়ে বুড়ি খুব নিশ্চিত। এমন যার অতীত তাকে কেন অবন্তীর রাজা তাঁর সভায় দাঁড়াতে দেবেন? রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করতেই পারবে না কোনোদিন ধ্রুবপুত্র। আর রাজ-অনুগ্রহ ব্যতীত কোনো মানুষ কি জীবনে উন্নতি করতে পারে, না ক্ষমতা অর্জন করে? উদ্ধব দাসের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।

তাম্ৰধ্বজ জিজ্ঞেস করে, উদ্ধব দাস আজ কি এসেছিল ?

হ্যাঁ।

কী বলে সে?

এখনো আশা ছাড়েনি? ওকে আমার ভয় করে, খুব ভয় করে।।

ভয়ের কথাটা বলেছিল গন্ধবতী বুড়ি পার্বতীকে। শুনে বুড়ির কী হাসি! উদ্ধব নাকি অতি সরল মনের, সরল প্রকৃতির মানুষ। গন্ধবতীকে রানী করে রেখে দেবে। যদি বলে গন্ধবতী, উদ্ধবের সঙ্গে মিলতে পারে যে-কোনো নির্জন জায়গায়, সে ব্যবস্থাও করে দেবে বুড়ি।

তাম্ৰধ্বজ বলে, তারপর কী হলো?

তারপর গন্ধবতী আর পার্বতী পৌঁছেছিল শিপ্রাতীরে কামদেবের মন্দিরে। মন্দির নয়, সে যেন যৌবনের উপবন। মন্দিরের পথে শত ফুল ফুটেছিল। কাপাসের তুলো উড়ছিল, ভ্রমর উড়ছিল, আমের মঞ্জরীর সুগন্ধ ছিল কত। ছিল বকুল ফুলের গন্ধ, ছিল নাম না জানা বুনো ফুলের তীব্র সুবাস। দূর থেকে  মনে হচ্ছিল মেলা বসে গেছে। রঙীন মেখলা, রঙীন উত্তরীয় উড়িয়ে আসছিল যুবতীরা। তাদের পিছু আসছিল ভ্রমরের মতো মধুলোভী যুবকেরা। যুবতীদের অনেকেই ছিল নগরবধূ। তাদের নাগররা তাদের হাত ধরে চলছিল। বল্লকী মৃদঙ্গ নিয়ে গান গেয়ে গেয়ে আসছিল গায়কের দল। আটবেহারা পালকি বয়ে নিয়ে এল অবন্তীর রানী ভানুমতীকে। সাজ সাজ রব উঠল। তখন তারা মন্দিরে প্রবেশাধিকার পেল না। কত সময় দাঁড়িয়ে থাকল। দেখল রানী ভানুমতীর সঙ্গে আছে  রাজার প্রহরী। আসার কথা ছিল রাজ-সেনাপতি, রাজার অনুজ কুমার বিক্রমের, তিনি নাকি আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। গন্ধবতীরা দেখল এল কত নববধূ তাদের স্বামীর হাত ধরে হাসতে হাসতে। এল কত প্রেমিক তাদের প্রেমিকার মুখখানি দেখার আশায়। কত জন এল একা, এল শুধু কামদেবের কাছে প্রার্থনা জানাতে, কতজন আবার এসেছে শুধুই ফূর্তির আশায়। যদি সুযোগ পায় ফুলের শর ছুঁড়ে দেবে কোনো যুবতীর বসনে। বসন সব রঙীন। লাল, নীল, হরিদ্রাবর্ণ, হরিৎবর্ণ, গোলাপী, আকাশী। কত রকম রঙ সেই সব মেখলায়, উত্তরীয়তে। বাতাসে আবীর উড়ছিল। বাগানের দিকে আড়ালে ছুটে যাচ্ছিল আবীর ছড়ানো স্ত্রী-পুরুষ। যুবতীদের ধাওয়া করছিল যুবকের দল। ফুল ছড়িয়ে যাচ্ছিল। অশোক ফুলের পাপড়িতে পথ রঙীন। বাগানে বীণা বাজাতে বসেছিল এক গণিকা। সুর যত না উঠুক, তারের ঝঙ্কারেই তাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছিল কতজন! 

বাগানের অজ্ঞাত কোণ থেকে উড়ে আসছিল শীৎকার ধ্বনি। বাতাসে এক আশ্চর্য গন্ধ উড়ছিল। সেই গন্ধ কিসের? বুড়ি পার্বতী বলছিল, কামদেবের গন্ধ, চৈত্র পূর্ণিমায় কামদেব ছড়িয়ে যান আকাশে বাতাসে, তার গন্ধ পায় যে মানুষ সে সৌভাগ্যবতী হয়।

কামদেবকে দেখেছিলে? জিজ্ঞেস করে তাম্ৰধ্বজ।

দেখেছিলাম। গন্ধবতী মুখ তুলল। দৃষ্টি মেলে ধরে তাম্ৰধ্বজের উপরে। তাম্ৰধ্বজ আকাশের দিকে তাকিয়ে কথাটা জিজ্ঞেস করেছে, যেন আকাশেই রয়েছে গন্ধবতী। মুগ্ধ হলো গন্ধবতী আচার্য বৃষভানুর শিষ্যর দিকে তাকিয়ে। বৃষভানুর শিষ্য আকাশের দিকে চেয়ে আবিষ্ট।

ভাগ্যবতী দেখল কামদেবকে। আহা কী সুন্দর তিনি! ঠিকই বলেছিল বুড়ি পার্বতী। সখার রূপটি যেন কামদেবের সঙ্গে তুলনীয়। বুড়ি বলেছিল, নাকি সে নিজেই ভেবেছিল তা। তাঁর নাসিকা সুচারু, উরু, কটি, জঙ্ঘা, সুবৃত্ত। কুসুমরঙের বস্ত্রখানি তার কটিদেশ আবৃত করেছিল। কী বিস্তৃত তার বক্ষদেশ। ওই বক্ষদেশ যেন গন্ধবতীকে নির্ভয় করে তোলার জন্য। গন্ধবতীকে আশ্রয় দেওয়ার জন্য। যে-কোনো নারীর আরাধ্য ওই আশ্রয়। চক্ষুদুটি, মুখমণ্ডল, ওষ্ঠাধর, পদতল, নখ, সবই তাঁর আরক্তবর্ণ। মকরবাহনে বসেছিলেন কামদেব বকুলফুলের স্তূপে। তাঁর হাতে কুসুমধনু, কুসুমশর। তার সামনে জ্বলছিল ঘিয়ের প্রদীপ। কামদেবকে অশোক, বকুল ফুলে অর্চনা করে সে অনিমেষ দৃষ্টিতে স্থির হয়েছিল। দেবতা তার দিকে চেয়েছিলেন যেন। গন্ধবতীর দু’চোখে তখন জলের ধারা।

তাম্ৰধ্বজকে সে দেখল কুয়াশা অন্ধকারে মিশে যেতে। চলে যাচ্ছে দশার্ণদেশীয় জ্যোতির্বিদ। গন্ধবতী। এগিয়ে এল, শেষ হয়নি সব।

ফিরল না তাম্ৰধ্বজ। হাঁটতে লাগল। আঙিনা পার হয়ে গেল।

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top