সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ৯ই ডিসেম্বর ২০২১, ২৫শে অগ্রহায়ণ ১৪২৮

লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চব্বিশ) : কাজী মাহমুদুর রহমান


প্রকাশিত:
২০ অক্টোবর ২০২১ ১০:২৪

আপডেট:
৯ ডিসেম্বর ২০২১ ১৯:১৬

 

এখন আমার স্বস্তি ও আনন্দ। এখন নতুন দায়িত্ব হচ্ছে আমাকে প্রাথমিকভাবে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে চার সপ্তাহের জন্যে প্রশিক্ষণ নিতে হবে যেটার নাম ট্রেনার্স ট্রেনিং। এই কোর্সে ফ্রান্সের নবীন চিত্র-শিল্পীরা ছাড়াও অন্য দেশের নবীন চিত্র-শিল্পীরা অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা সর্বমোট কুড়িজন। আমি তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এই প্রশিক্ষণ কোর্স যদি আমি সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্ত করতে পারি এবং ডিসটিংশন পাই তবে আমাকে জুনিয়র ট্রেনার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। আর এই ট্রেনার হিসাবে কাজ করতে করতে আমাকে তিন বছরের অনার্স গ্রাজুয়েশন করতে হবে। চিত্র শিল্পে নিজের দক্ষতা ও মেধার পরিচয় দিতে হবে। এই গ্রাজুয়েশন কোর্সে আমি প্রথম শ্রেণি পেলে তবেই আমাকে এই প্যারিস কলেজ অব আর্টস এ আমাকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এইসব প্রশিক্ষণ আর অনার্স কোর্স অধ্যয়নকালে আমি যে পরিমান স্কলারশিপ পাব তা সম্মানজনক এবং নির্ধারিত বেতনের চাইতে কোনো অংশে কম নয়।
এই ধরণের সুযোগ পাওয়া আমার জন্যে সৌভাগ্য ও ইতিবাচক বিষয়। আর নেতিবাচক বিষয়টি হচ্ছে মেধা অনুযায়ী ডিসটিংশন বা প্রথম শ্রেণি না পেলে দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো শিল্পীর কলেজ অব আর্টস এ শিক্ষকতা করার সুযোগ নেই। তাকে এই কলেজ ছেড়ে অন্য কোথাও নিজের ভাগ্য যাচাই করতে হবে।
আমি ভবিষ্যত থেকে অনেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে। দূর আকাশ থেকে রক্তমেঘ, দূর রুক্ষ পাহাড় থেকে কালো পাথর, ধূসর মরুভূমি থেকে রিক্ততা, অরণ্য থেকে ভালোবাসা, আর উত্তুঙ্গ সমুদ্র থেকে উত্তাল ঢেউয়ের শব্দ নিয়ে রেখায় রেখায় আমাকে আমার জীবনের মানচিত্র আঁকতে হবে শুধু এইটুকুই জানি।
[শিক্ষা নয় আনন্দ এবং আনন্দের মাধ্যমেই শিক্ষা গ্রহণ]
আমাদের শিক্ষা কোর্সের বিশজন শিক্ষার্থীর প্রথম দিনটি কাটল নিজেদের মধ্যে আলাপ, পরিচয়, হাসি, গল্প ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে। ছবি আঁকা-আঁকির জীবনে আমরা যে সকল হাস্যকর পরিস্থিতি বা দুর্ভোগের শিকার হয়েছি সবাইকে এক এক করে সেই সব গল্প বলতে হল। সবার গল্পই মজাদার, চমকপ্রদ। আমি বললাম, আমার রিকশার পেছনে শ্যামশ্রীর ছবি আঁকা নিয়ে সেই নাজেহাল অবস্থার গল্প। আমার গল্প শুনে সবার কৌতূহলী প্রশ্ন, তারপর? তারপর কী হল? সেই মেয়েটি কি তোমার ভালোবাসায় পড়ে গেল? নাকি তুমিও? সেই মেয়েটির ছবি কি তোমার কাছে আছে? নেই? যদি না থাকে তাহলে এক্ষুণি তোমার মন থেকে তোমার স্মরণ শক্তি থেকে সেই মেয়েটির ছবি এঁকে আমাদের দেখাও। আমরা বঙ্গললনার ছবি দেখতে আগ্রহী। যদি এঁকে না দেখাও তাহলে মনে করব এটা তোমার বানোয়াট গল্প।
আমি কোর্স ডিরেক্টর আর সতীর্থ শিক্ষার্থীদের চাপে পড়ে বোর্ডে একটা আর্ট পেপার পিন দিয়ে সেটে কালার পেন্সিল হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলাম শ্যামশ্রীর হাসি হাসি মুখটি। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম তার মুখ এখনও আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে উজ্জ্বল। আমি রঙিন রেখায় রেখায় তার মুখটি বোর্ডের ক্যানভাসে আঁকলাম ওমর আলীর কবিতার মতো। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই শ্যামশ্রী যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। তার চোখে যেন কৌতুক প্রশ্ন, এই, তুমি কেমন আছ? আমি ফিস ফিস করে বললাম, ভালো আছি শ্যামশ্রী, আমি ভালো আছি, তুমি ভালো থেক।
শ্যামশ্রীর ছবিটি দেখে সবাই মুগ্ধ। বঙ্গ ললনারা এত মায়াবী? এত লাবন্যময়ী?
সবার কন্ঠে যেন আফসোসের সুর, হে মশিঁয়ে তাইমুর, তোমার হৃদয়ে কি দয়ামায়া নেই, ভালোবাসা নেই? মেয়েটিকে নিষ্ঠুরের মতো একলা ফেলে তুমি পড়ে আছ এই দেশে। তোমার কি এতটুকু কষ্ট হয় না তার জন্যে? তুমি কি হৃদয়হীন?
আমি বললাম, বন্ধুগণ, ভারতে একজন বিখ্যাত উর্দু ভাষার কবি ছিলেন যার নাম মীর তকি। তিনি তার মৃত্যুকালে প্রেমিকদের জন্যে একটি উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন সেটা হচ্ছে, ‘আর যা কিছু হতে চাও হোয়ো, কিন্তু প্রেমিক কিছুতেই নয়’। সুতরাং আমি এখন চিত্র প্রেমিক।
আমার কথায় হাসির বন্যা বয়ে গেল।
প্রথম দিবসটি শেষ হল চিত্রশিল্প সম্পর্কিত নানা ইতিহাস, বিশেষ বিশেষ শিল্পীদের বিখ্যাত শিল্পকর্মের অন্তরালের কথা, দুঃখ-যন্ত্রণার কথা নিয়ে। কোর্স ডিরেক্টর মশিঁয়ে বের্ণার আমাদের মনে করিয়ে দিলেন শিল্পকর্ম মহৎ কিন্তু সেই শিল্পের পথ দুর্গম, কংকরময় এবং গাঢ় আর্তনাদের পথ। এই পথ আমরা কীভাবে অতিক্রম করব সে উপায় আমাদেরকেই উদ্ভাবন করতে হবে। মনে রাখতে হবে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য নির্মাণ শুধুমাত্র শিল্পীর নিজের আনন্দের জন্যে নয়। যে শিল্পকর্ম অন্যকে বিস্মিত করবে, মুগ্ধ করবে এবং দর্শককে রহস্যময়তার জালে আবদ্ধ করবে সেখানেই শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির সার্থকতা। তবে শিল্পকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে জটিল ও দুর্বোধ্য কবিতার মতো নির্মাণ করলে সে শিল্পের ভাষা আর নান্দনিকতা কেউ বুঝবে না এবং দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য। আমাদের অতীতে অভিজ্ঞতা বলে, যে শিল্পে সহজবোধ্যতা নেই, বিস্ময় নেই, কৌতূহল নেই তা হয়ে যায় ধূলি ধূসরিত জঞ্জাল।
পরদিন থেকে শুরু হল আমাদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রম। রং চেনার পালা, এক রং থেকে অন্য রং মিশ্রণের জাদুকরি খেলা। চিত্রাঙ্কনে এখন তো ব্যবহৃত হয় নানা ধরণের রাসায়নিক রং। কিন্তু অতীতে কোনো রাসায়নিক রং ছিল না। প্রকৃতিই ছিল চিত্রকরদের রং এর সংগ্রহশালা। ফুল থেকে, পাতা থেকে, কয়লা ও পাথর চূর্ণ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রং তৈরি করা হত এবং সেইসব রং চিত্রাঙ্কনে, নক্শায় ব্যবহার করা হত। সেই সব চিত্রের রং, নক্শার রং আজও অম্লান।
আধুনিক কালে চিত্রাঙ্কনে কত রকম পদ্ধতি আর রং এর ব্যবহার চিরাচরিত তুলির পরিবর্তে শুধুমাত্র আঙুল বা নখ দিয়ে, কালো রং এর পেন্সিল দিয়েই একটি দৃশ্য চিত্র বা কয়েকটি বর্ণকে মুহূর্তেই দর্শকদের তাক লাগিয়ে অন্য ভাবনায় পরিবর্তন ও দৃশ্যমান করা যেন জাদুর খেলা মনে হয়।
আর্ট পেপারে পেন্সিলে স্কেচ, জলরং, ক্যানভাসে তেলরং, এক্রোলিক, পাথর ও কাঠ খোদাই করে ভাস্কর্য নির্মাণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা চিত্রকর, ভাস্কর ও অধ্যাপক রিসোর্স পারসন হিসাবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। প্রতিদিন সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত স্কেজুল অনুযায়ী তারা চিত্র শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের কুড়িজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে গল্পের মতো আলাপ আলোচনা ও মত বিনিময় করেন। কেউই শুকনো নিরস বক্তৃতা দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করেন না। আমাদের প্রাকটিকাল কাজের উপরেই বেশি গুরুত্ব দেন। আমরা আমাদের সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনাকে ক্যানভাসে বা ভাস্কর্য নির্মাণে কীভাবে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী করতে পারি সে বিষয়ে তারা পরামর্শ দেন, হাতে কলমে কাজ শিখতে ও সম্পন্ন করতে সাহায্য করেন। আমরা শিক্ষার্থীরা এই সকল গুণীজনের সাহচর্যে, তাদের শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে যা শিখছি, সেই জ্ঞানলব্ধ শিক্ষাকে কীভাবে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রয়োগ করতে পারি এটাই হচ্ছে প্রশিক্ষণ কোর্সের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
আমাদের প্রথম মধ্যাহ্নের কাজ হল আমাদের যার যার দেশের চিত্রকর্ম পরিচিতি। নদী, নিসর্গ, নর-নারীদের বিচিত্র জীবন আর ভালোবাসা, গ্রাম জীবনের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ উৎসব, মেলা আর খেলা। আমি আমাদের দেশের পটুয়া কামরুলের চিত্রধারার বেশ কয়েকটি ছবি আঁকলাম জল রং এ। প্রশংসিত দৃষ্টি আকর্ষণ করল সবার।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ জুড়ে আমাদের যেন একটা কর্ম নেশার মধ্যে কাটতে থাকে। প্রশিক্ষণের স্কেজুল ও বিষয়বস্তুর নিয়ম অনুযায়ী রিসোর্স পারসনরা আমাদের কখনো কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করেন। প্রতিটি গ্রুপ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, মত বিনিময় করে জলরং, তেল রং, কাঠ বা পাথর খোদাইয়ের মাধ্যমে একটা আর্ট ওয়ার্ক দৃশ্যমান করা হয় একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তারপর প্রতিটি গ্রুপের টিম লিডাররা তাদের সদ্য নির্মিত শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা দেয়। তাকে নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয় এবং যুক্তি ও ব্যাখ্যাকে আরো সবল করতে হয়। অধিকাংশ দিনে আমার গ্রুপের সদস্যরা আমাকেই টিম লিডারের দায়িত্ব দেয়। বিষয়টি আমি উপভোগ করি এবং নেতৃত্বদান করতে করতে আমার ভেতরে একটি আস্থার ভাব ফিরে আসে। সবশেষে কোর্স ডিরেক্টর ও রিসোর্স পারসন তাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও মতামত জ্ঞাপন করেন। আমাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেন। অবশ্য প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করেন না। আমাদের কর্মদিন শেষ হয় বিকেল পাঁচটায়।
ছুটির পর আমি কোথাও বেড়াতে যাই না। জুলিয়াঁকে অনুরোধ করেছি এই প্রশিক্ষণকালে আমার এখানে না আসতে। লাইব্রেরি থেকে অসংখ্য চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বিষয়ক সচিত্র বইপত্র আমি ধার করে আনি। রাতভর সেগুলো পড়ি এবং দেখি। চিত্রকলার আদি ও বর্তমান সব ইতিহাস আমি মনের মধ্যে গেঁথে নেবার চেষ্টা করি। চিত্রকলা সম্পর্কিত বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু বেলাভূমিতে নিউটনের মতো পাথর কুড়োতে কুড়োতে হারিয়ে যেতে থাকি। পথ খুঁজতে থাকি। বড় দুঃশ্চিন্তায় থাকি কাল আমার জন্যে কী অ্যাসাইনমেন্ট? কোন পদ্ধতিতে সেটা সম্পন্ন করব, কীভাবে সেটা প্রেজেন্ট করব? কী ব্যাখ্যা দেব? সব ভাবনা, প্রশ্ন, উত্তর আমার মাথার মধ্যে যেন জটাজাল পাকিয়ে যায়। আমি ঘুমুতে পারি না। রাতভর শূন্য শয্যায় আমি ডানা ভাঙা পাখির মতো দাপাদাপি করতে থাকি।

 

চারটি সপ্তাহ ধরে অসীম ধৈর্য্য ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে প্রাচীন ও আধুনিক শিল্প সভ্যতার বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আমাদের কতকিছু জানা এবং বুড়ি ছোঁয়ার মতো কিছু শেখা। এই জানা ও শেখার কোনো শেষ নেই। শিখে যেতেই হবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষণ কোর্সের সময় সীমিত। কিন্তু প্রশিক্ষণের মাত্রা ও চাপ বাড়ছে ক্রমাগত। কোর্সটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তো সমাপ্ত করতেই হবে। শেষ দিনটি হবে আমাদের নিজ নিজ ভাবনা-চিন্তা অনুযায়ী যে কোনো মাধ্যমে চিত্র ও ভাস্কর্য প্রদর্শন।
সমাপ্তি দিনের তিন দিন আগের এক শুক্রবার বিকেলের কথা। আমি ছুটির পর ডরমিটরিতে আমার কক্ষের বন্ধ দরজার সামনে দেখি সুদৃশ্য লেদার কভারে আবৃত একটি বেহালা এবং এক গুচ্ছ ফুল। বেহালার সঙ্গে রঙিন ফিতা দিয়ে সংযুক্ত একটি বড় কার্ড। তাতে লেখা-এ স্মল গিফট ফ্রম সোফি। কার্ডে নিজের হাতে ইংরেজিতে লেখা,
‘প্রিয় বন্ধু, আজ মধ্যরাতেই আমি প্যারিস ত্যাগ করছি। আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে আমি জার্নালিজম অ্যান্ড কম্যুনিকেশনে একটি স্কলারশিপ পেয়েছি। তাই এই চলে যাওয়া। নাটকীয়ভাবে তোমার কাছ থেকে আমার বিদায় নেবার ইচ্ছে নেই। তাই নীরবে বিদায় নেবার আগে তোমার জন্যে রেখে গেলাম একটি বেহালা যা ছিল তোমার আকাংখা, আর রেখে গেলাম একগুচ্ছ ফুল যা ছিল আমার আকাক্সক্ষা। ভালো থেকো প্রিয় বন্ধু।’
আমি বেহালা আর ফুল হাতে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
শনি ও রবিবার ছুটি। কিন্তু আমাদের ছুটি নেই। এই দুটো দিনের মধ্যে যার যার চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী যে কোনো মাধ্যমে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হবে এবং সোমবার ফাইনাল প্রজেক্ট হিসাবে তা প্রদর্শন ও ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই ফাইনাল প্রজেক্ট দর্শন ও বিচার বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন আর্ট কলেজের কিছু অধ্যাপক এবং আমন্ত্রিত রিসোর্স পারসনগণ।
আমি কী ছবি আঁকব, জলরং এ নাকি তেল রং এ তা এখনও ঠিক করিনি। মাথায় অনেক আইডিয়ার জটাজাল। কিন্তু সব জট ছাড়িয়ে যে কোনো একটি সহজ সরল ছবি আঁকতে হবে শুধু এইটুকুই জানি। আমার মাথাটা এখন পরিষ্কার রাখা দরকার।
আমি সোফির ভায়োলিনটা কাভার খুলে দেখলাম। ঝকঝকে নতুন ভায়োলিন। ছড় টেনে বাজাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে সেটা বেসুরে বেজে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করে সেই অন্ধ বেহালা বাদকের কথা চিন্তা করলাম। স্মরণ করলাম তার ভায়োলিনে ছড় টানার কলা-কৌশল আর আঙুলের খেলা। তারপর অন্ধের মতোই বাজালাম পদ্মার ঢেউরে গানটি। মনে হল আমি বোধহয় কিছুটা পারছি। এরপর আবার বাজাতে চেষ্টা করলাম লালনের সেই বিখ্যাত গানটিযে জন গুরুর ভাব জানে না। গানটি ছন্দময়, সুরেলা, তালের গান। আমি আমার ফাইনাল প্রজেক্টের ছবির কথা ভুলে রাতভর এই দুটি গানই বেহালায় বাজাতে থাকলাম। শেষ রাত্রে মনে হল হ্যাঁ, সোফির দেওয়া এই বেহালার তারে, সুরে প্রথম আমার মনের কথা, হাতের কথা শুনতে পাচ্ছি। সোফির মুখটি মনে করে বেহালায় একটি চুমু দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে গেলাম ... এই একটি মাসের মধ্যে এই প্রথম শান্তির ঘুম।
ছুটির শনি ও রবিবার
শনি ও রবি এই দুটো দিন আমি অবিশ্রান্ত পরিশ্রমে দুটি ছবি এঁকেছি। একটি আর্ট পেপারে জল রংএ। অন্যটি ক্যানভাসে তেল রং এ। যদিও প্রত্যেকের একটি করে ছবি আঁকার কথা আমি সে নিয়ম ভঙ্গ করেই দুটি ছবি আঁকলাম কেননা একটি ছবি আর একটি ছবির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যদি অনুমতি পাই তবে দুটি ছবিই প্রদর্শন করব। না পেলে একটি।
ছবি দুটি আঁকতে আঁকতে আমি যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছি তখন হানাদার ক্লান্তির শিকারী বিড়াল তাড়াতে বেহালা বাজিয়েছি আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কিছু পুরাতন অথচ চিরকালের ভালোবাসার গান, ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, গানে মোর ইন্দ্রধনু, তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার, এই রাত তোমার আমার, অলির কথা শুনে বকুল হাসে, একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ...। বেহালার তারে, সুরে আমি আমার মৃত বাসনার, মৃত ভালোবাসার গানগুলি গাইতে থাকলাম।
সোমবার
আজ সোমবার। আমরা সবাই যার যার ছবি নিয়ে বিশেষভাবে সজ্জিত আর্ট গ্যালারিতে। সম্মানিত বিচারকমন্ডলী ও বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ উপস্থিত। তাদের মধ্যে আছেন মশিঁয়ে আতোঁয়ান। আমি ওদের দেখে কিছুটা নার্ভাস। ওরা আজ আমার ভাগ্য-নিয়ন্তা। আমি আল্লাহকে ডাকলাম। স্মরণ করলাম বাবার মুখ, জয়ী মা’র মুখ। মনে মনে বললাম, জানি আমি বড় পাপী, তবু তোমরা আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে শক্তি দাও।
আজকের ফাইনাল প্রেজেন্টেশনে আমি শুধু ছবি দুটিই আনিনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছি আমার বেহালাটিও। আমার সুপ্ত ইচ্ছে আমার বেহালাটিও আমার সঙ্গে কথা বলবে। আজ আমি মরীয়া। হয় আজ আমি বরবাদ হয়ে যাব, অথবা বিজয়ী হব। কিন্তু আমার বুকের ভেতর ভয়, ধুপ ধুপ ... শুনতে পাচ্ছি ধান ভানার গান, যেন কোনো গৃহ বধূর অবিরাম ঢেঁকি পাড়ানির শব্দ, ধুম ধুম আওয়াজ। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যেও দেখলাম মাদাম জুলিয়াঁকে। কথা হল না। দৃষ্টি বিনিময় হল। তার দৃষ্টিতে যেন আশ্বাস আর অভয়দান।
করতালিতে মুখর শব্দের মধ্যেই এক এক করে ছবি প্রদর্শনী শুরু হল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালককে আমি আগেই অনুরোধ করে রেখেছিলাম সর্বশেষে যেন আমাকে আহ্বান করা হয় আমার ছবি প্রদর্শনের। সঞ্চালক আমার অনুরোধ রক্ষা করেছেন।
ফাইনাল প্রজেক্টে সর্বমোট বিশজন শিক্ষার্থীর নাম ধরে ধরে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রদান করে সঞ্চালক আহ্বান জানালেন ছবি এবং ভাস্কর্য প্রদর্শনের। ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী আমন্ত্রিত শিক্ষার্থীরা একে একে তাদের ছবি প্রদর্শন শুরু করলেন। আমার দৃষ্টিতে প্রতিটি ছবিই অসাধারণ, অভাবনীয় চিন্তাধারার। প্রশংসা আর করতালিতে মুখরিত হল ঘর, আর্ট গ্যালারি। এদের ছবির সঙ্গে আমার এখনও অপ্রদর্শিত ছবি তুলনামূলক বিচারে নিজেকে বড় দৈন্য মনে হল। শিল্পের মানদন্ডে আমার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব নয় এদেরকে টপকে যাওয়া। ওদের ছবি দেখে সবার সঙ্গে হাততালি দিচ্ছি। কিন্তু মন বিষন্ন। সিদ্ধান্ত নিলাম যদি আমি উত্তীর্ণ না হতে পারি তাহলে প্যারিসকে বিদায় জানিয়ৈ আমি দেশে ফিরে যাব। বিদায় প্যারিস।

সর্বশেষে আমাকে আমন্ত্রণ। আমার এক হাতে দুটি ছবির মোড়ক, আর এক হাতে বেহালা।
আমি জলরংএ আঁকা ছবিটি স্ট্যান্ডের বোর্ডে পিনবদ্ধ করলাম। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ও সেমি অ্যাবস্ট্র্যাক্ট পদ্ধতির মিশ্রণে একটি বিষণ্ন নারীর জল টলমল বিশাল চোখ যেন পদ্মদিঘি। সেই জলটল চোখের ভেতর এক অন্ধ বেহালাবাদক বেহালা বাজাচেছ। মনে হচ্ছে ঐ নারীর চোখের জল এক্ষুণি গড়িয়ে পড়বে, আর আমি যেন বেহালা বাদক নিমেষেই ডুবে যাব চোখের দিঘি জলে।
সবাই অবাক দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে। হলে পিন পতন নিস্তব্ধতা। আমি বেহালাটা হাতে নিলাম। ছবির পাশে বেহালা হাতে অন্ধ বেহালা বাদকের মতোই দাঁড়িয়ে আছি ভাবছি আমি এখন কোন সুরে বেহালা বাজাব? আমার যে কিছুই মনে পড়ছে না। আমার চোখের সামনে এখন সবকিছুই অস্পষ্ট। সব দৃশ্যই অদৃশ্য। কোনো গানের কথাই মনে পড়ছে না। শ্যামশ্রীর চোখ যেন আমার বুকের ভেতরে কথা বলে উঠল, আমার চোখের দিকে তাকাও। আমার যত কষ্ট, যত দুঃখ, চোখের যত জল সবই তো তুমি দিয়েছ। এখন বেহালা হাতে কেন নিঃশব্দ, তন্ময়? হে বাদক, বাজাও, বাজাও তোমার বেহালা। আমাকে যদি পোড়াতে ভালো লাগে আরো পোড়াও আমাকে যদি কাঁদাতে ভালো লাগে আরো কাঁদাও ... কাঁদাও হে শিল্পী, কাঁদাও ...
বেহালায় আমার অজান্তেই যেন বেজে উঠল বশির আহমেদের কণ্ঠে খান আতাউর রহমানের একটি গানের বিষণ্ন কথা, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো, জ্বালো আগুন আরো জ্বালো, ঢালো আরো ব্যথা ঢালো।’ আমি অন্ধের মতোই সেই গান গাইলাম আর বাজালাম। যখন গান আর বাদন শেষ হল তখন আমার চোখে পানি। অন্যরাও নিস্তব্ধ। তারা আমার কন্ঠের মাধুর্য তাদের হৃদয় বোধহয় ছুঁয়ে গেছে। তাদেরও কারো কারো চোখ ছলছল। আমার জন্যে কোনো করতালি নেই, উচ্ছ্বাসের শব্দ নেই। বুঝতে পারলাম আমি পরাজিত।
আমি মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে মুখ তুলে বললাম, শ্রদ্ধেয় সুধীম-লী, আমি একজন সামান্য রিক্শ পেইন্টার থেকে শিল্পী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা বোধহয় পারলাম না। আসলে মানুষের কোনো আশাই পূর্ণ হয় না যদি পথ না দেখা যায়। আমি জীবনে এত কষ্ট পেয়েছি সেই কষ্টটাকে একটি নারীর চোখের টলমল জলের ভেতর দিয়ে উজাড় করে দিতে চেয়েছি। ঐ নারীর চোখের জলের ভেতর যে অন্ধ বেহালা বাদক সে আমি। আমি এক অন্ধ ব্যর্থ বেহালা বাদক। আমাকে ক্ষমা করবেন।
আমি সরে যাবার উপক্রম করতেই একজন বিচারক বলে উঠলেন, থামো হে যুবক। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে নারীর চোখে জলটলমল, সেই চোখের জল যেন এক্ষুণি গড়িয়ে পড়বে। আর তুমিও ডুবে যাবে তার জলের অতলে। কিন্তু জলটা পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না। কেন পড়ছে না?
আমি বললাম, আমি যে তাকে আমার হৃদয় উজাড় করে স্বর্গের পাখির মতো আমার বিরহ বেদনার গান শুনিয়েছি, আমার বিষণ্ন যত সুর এই বেহালায় উজাড় করে ঢেলে দিয়েছি। তাই আমি এখনও স্থির তার চোখের জলে, তার হৃদয়ে, তার স্মৃতিতে।
অন্য একজন বিচারক বললেন, তুমি যে গান গেয়েছ তার ভাষা আমরা বুঝিনি। কিন্তু তোমার কন্ঠ আর বেহালার সুর আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ঐ নারীর চোখের জল শুধু তার চোখে নয়, আমাদের হৃদয়েও, আমাদের চোখেও কষ্ট দিচ্ছে। শুনে রাখো যুবক, বিষন্ন বেদনার কথায় কেউ আনন্দে করতালি দেয় না, শিস বাজিয়ে হল মুখরিত করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে না। আমরাও তা করিনি। তুমি বোধ হয় দুটি ছবি এনেছ। আমরা তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি দ্বিতীয় ছবিটি প্রদর্শন করতে।
আমি ক্যানভাসে তেল রং এ আঁকা দ্বিতীয় ছবিটি বোর্ডে প্রথম ছবির উপরেই পিন বন্ধ করলাম। ছবিটির বিষয়বস্তু হচ্ছে অন্ধ বেহালা বাদক এক অন্ধকার গলি পথে শরীর দুলিয়ে বেহালা বাজাচ্ছে। তার বেহালা বাদকের সুরে এক কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারী তার রোগ যন্ত্রণা ভুলে পঙ্গু হাত, বিকৃত মুখ নিয়ে সেই গানের তালে তালে নাচছে। অন্ধকার পটভূমিতে তাদের চোখে মুখে, দেহের ওপর যৎসামান্য নীল আলো। সেই নীল আলোটিই তাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত আনন্দ ও নৃত্য ছন্দ।
আমি হাতে বেহালা তুলে নিলাম। বললাম, এই ছবির কথা আমার কন্ঠের গান আর বেহালা বাদনের মধ্য দিয়েই প্রকাশের অনুমতি দিন। যে গানে সুর আছে সে গানের ভাষা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।
আমি আমার হাতের বেহালায় প্রথমে সুর তুললাম, ‘যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নেই লেনা দেনা। যে জন গুরুর ভাব জানে না ....’
এটি আমাদের দেশের এক প্রাচীন বাউল লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গান। আধ্যাত্মবাদের গান। এখানে বিষণœতা নেই। আছে মরমী কথা। এটি এমন একটি গান যে গান শুনলে শরীর এমনি এমনিই দুলে উঠবে, কথা, গানের সুর ছুঁয়ে যাবে হৃদয়। আমি বেহালা বাজাতে বাজাতেই গানটির সার কথা ইংরেজি অনুবাদের ভঙ্গিতে সুরের তালে তালে বললাম, তারপর বেহালা বাদনের সাথেই বাউল নৃত্যের দেহ ভঙিমায় মূল বাংলায় গান গাইতে শুরু করলাম নিজেকে উজাড় করে দিয়ে। আমি ‘ভাব’ কথার পরিবর্তে প্রেম কথাটি বসালাম ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রাখতে। বাজাতে বাজতে কখনও দর্শকদের সম্মুখে যাই, কখনো বিচারকম-লীর সম্মুখে যাই। দেখলাম ওরাও যেন সুরের তালে তালে গানের ঝংকারে বসে বসেই শরীর দোলাচ্ছেন, মাথা দোলাচ্ছেন, তাল ঠুকছেন। তারাও ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছেন লালনের গানে আমার কন্ঠের ভেতর দিয়ে আর হাতের বেহালার সুরে।
আমার গান বেহালা বাদন শেষে হল ভর্তি দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করতালি। আমার বুকের ভেতরেও নদীর প্রবল স্রোতের মতো সেই শব্দের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি এবং আনন্দ। আজি আমি হারি বা জিতি তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। কিন্তু আমি একেবারে ব্যর্থ নই। আমি পেরেছি, দর্শকদের মুগ্ধ করতে পেরেছি।
উচ্ছ্বাসধ্বনি এবং হাততালি শেষে একজন অধ্যাপক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, লালন সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক বা মরমী গানের সাথে এই অন্ধ বেহালা বাদক আর কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারীর সম্পর্ক কী?
আমি বললাম, ভালোবাসা। অন্ধ বেহালা বাদক জানে যে নারীর সম্মুখে সে তার বেহালা বাজিয়ে আনন্দ দিচ্ছে সে একজন কুষ্ঠ রোগী। আর কুষ্ঠ রোগীনিরও আনন্দ তাকে কুষ্ঠরোগী জেনেও অন্ধ বাদক তাকে ভালোবাসার গানে আনন্দ দিচ্ছে। এখানে শরীরের সাথে শরীরের সম্পর্ক নয়, সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের। যেমন সম্পর্ক আমাদের আত্মার সাথে পরমাত্মার। আমরা তো ঈশ্বরকে চোখে দেখি না, তবুও আমরা আমাদের সব পাপ, পূন্য, ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে তার কাছেই সমর্পিত। আর এই আত্ম-নিবেদন কিংবা সমর্পণটা তখনই পূর্ণ হয় যখন মানুষ তার অন্তর্গত ভাব-ভালোবাসাকে উপলব্ধি করতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে।
আর একজন বিচারকের প্রশ্ন, তাহলে ভালোবাসা কি অন্ধ বাদকের মতো অন্ধ? ভালোবাসা কি কুষ্ঠ রোগীদের মতো বিকৃত? বিকলাঙ্গ?
এ ধরণের প্রশ্নে আমি বিপাকে পড়লেও তা বুঝতে দিলাম না। বললাম, ভালোবাসা অন্ধ নয়, কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত বিকলাঙ্গ নারীও নয়। আমি তো আগেই বলেছি ভালোবাসা দেহের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসা হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, আত্মার সাথে পরমাত্মার। আমার ছবিতে এই দুই নর-নারী প্রতিকী চরিত্র মাত্র। আমি বিজ্ঞ সুধীজনের কাছে একটিমাত্র প্রশ্ন করতে চাই, আমার চিত্রে এই অন্ধ বাদক আর কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারীর ভালোবাসার আনন্দ নৃত্য দেখে আপনাদের হৃদয়ে কি ঘৃণার সৃষ্টি হচ্ছে নাকি ওদের জন্যে মায়া মমতার সৃষ্টি হচ্ছে?
বিচারকমন্ডলী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর প্রশ্নকারী বিচারক বলে উঠলেন, না ঘৃণা নয়, আমি ভালোবাসাই অনুভব করছি। ঈশ্বর সবার হৃদয়ে যেন এমনই ভালোবাসার বোধ তৈরি করে দেন। আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই। ধন্যবাদ মশিঁয়ে তাইমুর। চিত্র শিল্পী হিসাবে আপনি বেঁচে থাকুন সবার হৃদয়ে, সবার ভালোবাসায়।
আবার প্রচন্ড করতালি নয়, যেন তুমুল বৃষ্টিপাতের শব্দে আমি ডুবে গেলাম।
অভিনন্দনে অভিনন্দনে আমরা বিশজন শিক্ষার্থীই সিক্ত। বিচারকম-লীর বিচার-বিশ্লেষণ আর চূড়ান্ত রায়ে গত এক মাসের পারফরমেন্স আর প্রেজেন্টেশনে আমরা সবাই ডিসটিংশন পেয়েছি। আর আমিই আজকের বেস্ট পারফর্মার অ্যান্ড প্রেজেন্টার। আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের প্রত্যেককেই সার্টিফিকেট অব মেরিট অর্থাৎ সনদ দেওয়া হল।
এরপর বিশাল পানোৎসবের আয়োজন। সেখানে সবার সঙ্গে সবার হাতের মিলন, আলিঙ্গন ও হৃদয়ের মিলন। প্রশংসায় আমরা আপ্লুত। জুলিয়াঁ ছুটে এসে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরল এবং তার দীর্ঘ চুম্বনে আমি বিব্রত। আলবার্ট নামের একজন সতীর্থ সরস মন্তব্য ছুঁড়ে দিল, হোয়াট এ লাকি গাই! এ লং কিস ফ্রম এ বিউটিফুল ফেয়ারি ইজ বেটার দ্যান অ্যান আওয়ার্ড। আই উইশ আই কুড হ্যাভ দ্যাট।
আলবার্টের কথা শুনে জুলিয়াঁ আমাকে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। আলবার্টের মুখভর্তি দাড়ি, গোঁফ। একরাশ গোঁফের আড়ালে তার ঠোঁট অদৃশ্য। জুলিয়াঁ তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে নিরীক্ষণ করল। রসিকতার কন্ঠেই বলল, হে গাই ইয়োর ফেস ফুল অব বিয়ারদেদ অ্যান্দ লাউজি মাউসতাস। আই দোন্ত সি এনি লিপ অর প্লেস তু কিস। সো গিভ মি ইয়োর আর্তিস্তিক হ্যান্দ আই উইল কিস অন দ্যাত।
আলবার্ট হাসতে হাসতে বলল, স্যরি মাদাম। মাই হ্যান্ড ইজ অনলি ফর মাই পেইন্টিং ব্রাশ। ইফ ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু কিস মি দেন ইউ উইল হ্যাভ টু ফাইন্ড আউট মাই লিপ।
জুলিয়াঁ হেসে বলল, নত দিস তাইম। ওয়েত ফর নেক্সত তাইম। কাম তু মি অ্যাজ এ ক্লিন শেভদ ম্যান। ইউ উইল গেত ইত।

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই মশিঁয়ে আতোঁয়ান আর মশিঁয়ে দানিয়েল এলেন। দুজনেই উষ্ণ করমর্দনে আমাকে অভিনন্দিত করলেন। বললেন, এক্সসেলেন্তে! এক্সসেলেন্তে! জানতাম, তুমি শুধুমাত্র চিত্র শিল্পী। কিন্তু তুমি যে এমন চমৎকার কণ্ঠশিল্পী, আর বেহালাবাদক তা আমাদের জানা ছিল না। ইউ হ্যাভ গিভেন আস এ বিগ সারপ্রাইজ। উই আর ভেরি হ্যাপি। নাউ ইউ উইল গেট হোয়াট ইউ ওয়ান্টেড।
আমি সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললাম, মেখসি, মেখসি মশিঁয়ে। থ্যাংক ইউ স্যার।
বিকেলের এই পার্টিতে সবার অনুরোধে আমাকে বেহালা বাজিয়ে গান গাইতে হবে। আমি ইংরেজি ভাষার বা ফ্রেন্স ভাষার কোনো গান জানি না এমন আপত্তি সত্ত্বেও আমাকে বাধ্য হয়েই আমার বেহালা বাদনের সঙ্গে পুরোনো বাংলা গান-পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য পদ্ম হৃদয় নিয়ে যা, যারে। আমার কন্ঠ আব্বাসউদ্দিন বা আব্দুল আলিমের মতো পরিশীলিত কন্ঠ নয়। তবুও আমি প্রাণখোলা কন্ঠেই গাইলাম। কন্ঠ, সুর বেহালা বাদন পদ্মার ঢেউয়ের মতোই বোধহয় সবার উপর দিয়ে বয়ে গেল।
আবার অনুরোধ আসল আরো একটি গান গাইবার। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের এই সমাবেশে বাংলা আর কী গান গাইব? এখন এই মুহূর্তে বাংলা করুণ, বিষণœ গান ভাষাগত কারণে কারো মন ছুঁয়ে যাবে না। এই পার্টিতে এই মুহূর্তে সবাইকে উন্মাতাল করার মতো গান গাইতে হবে। কিন্তু কী গান গাইব চট্ করে মনে পড়ল বাংলাদেশের তরুণ সম্প্রদায়ের সবচাইতে জনপ্রিয় গায়ক আজম খানের গাওয়া একটি মহাতালের মন মাতানো গানঅসম্ভব জনপ্রিয় গান“আলাল ও দুলাল, তাদের বাবা হাজি চান, চানখাঁ পুলে প্যাডেল মেরে পৌঁছে বাড়ি আলাল ও দুলাল।”বেহালা বাদনের সঙ্গে গানের মুখটি গাইবার সঙ্গে সঙ্গে সবাই তালে তালে নাচা শুরু করল। সুর আর তালের সঙ্গে যার যেমন খুশি নাচ। আমি বার বার ঐ একই গান ঘুরে ফিরে গাইতে লাগলাম যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি ক্লান্ত হলাম। নৃত্য, গান, শ্যাম্পেন, হুইস্কি, রেড ওয়াইনের মহোৎসব চলল। কয়েকজন আমাকে ধরে ছুঁড়ে দিতে লাগল শূন্যে, মহানন্দে-আর ওরা ওদের মতোই তালে তালে গাইতে লাগল-আলাল ও দুলাল ......।
এমনি করেই আমার একটি শ্রেষ্ঠ দিনের সমাপ্তি ঘটল।
উৎসব, আনন্দ শেষে জুলিয়াঁ আমাকে পাকড়াও করল। তার আবদার আমি আজ তার রাত্রের অতিথি। আমাকে সে মার্সেইতে নিয়ে যাবেই।
আমি জোড় হাতে তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, জুঁলি গত তিন দিন ধরে আমার বিশ্রাম নেই, ঘুম নেই। আমি ভীষণ ক্লান্ত। আমাকে ক্ষমা কর।
জুলিয়াঁ মনক্ষুন্ন হয়ে চলে গেল।
যদিও আমার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। তবুও আমি বেহালাটি কাঁধে ঝুলিয়ে পথে বেরুলাম। একটি ট্যাক্সি নিয়ে পথে পথে খুঁজতে লাগলাম সেই অন্ধ বেহালা বাদককে। খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়েও গেলাম পথের মোড়ে। আমি ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে তার কাছে এগিয়ে গেলাম। বেহালাটি বের করে তারে ছড়া টানলাম, লালনের সেই গানের সুরে যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা ...।
অন্ধ বাদক প্রথমে সামান্য চমকে গেলেও হেসে উঠল। বলল, যুবক তুমি শেষ পর্যন্ত বেহালা কিনেছ?
আমি বললাম, না। আমাকে এটা আমার বন্ধু উপহার দিয়েছে।
অন্ধ বাদক বলল, বন্ধুর উপহার ভালোবাসার উপহার। এটি সযতেœ ব্যবহার কোরো।
আমি বললাম, হ্যাঁ তা-ই করব। তুমি আমার বেহালাটিতে ছড় টেনে সুরে উদ্বোধন করে দাও।
অন্ধ বাদকের বিস্মিত প্রশ্ন, কেন আমি কেন? আমি তো একজন সামান্য ভিক্ষুক।
আমি বললাম, তুমি বেহালা বাদনে সুরের রাজা। তুমি আমার শিক্ষা গুরু। আমি তোমার সুরের ভিক্ষুক।
হা হা করে হেসে উঠল অন্ধ বাদক। তারপর আমার হাত থেকে বেহালাটি নিয়ে অপূর্ব সুরে বাজাল লালনের সেই গানটি যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা ...।
আজ ছবি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে আমি এই গানটি অপুট হাতে যেভাবে বাজিয়েছিলাম তার চাইতে আরো মাতোয়ারা এই অন্ধ বাদকের বাদন। এ যেন তার হৃদয় থেকে উৎসারিত আনন্দ, আরো ছন্দময়, গতিময়।
চলবে
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চব্বিশ)
কাজী মাহমুদুর রহমান
এখন আমার স্বস্তি ও আনন্দ। এখন নতুন দায়িত্ব হচ্ছে আমাকে প্রাথমিকভাবে একটি প্রশিক্ষণ কোর্সে চার সপ্তাহের জন্যে প্রশিক্ষণ নিতে হবে যেটার নাম ট্রেনার্স ট্রেনিং। এই কোর্সে ফ্রান্সের নবীন চিত্র-শিল্পীরা ছাড়াও অন্য দেশের নবীন চিত্র-শিল্পীরা অংশ নেবেন। প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা সর্বমোট কুড়িজন। আমি তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এই প্রশিক্ষণ কোর্স যদি আমি সাফল্যের সঙ্গে সমাপ্ত করতে পারি এবং ডিসটিংশন পাই তবে আমাকে জুনিয়র ট্রেনার হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। আর এই ট্রেনার হিসাবে কাজ করতে করতে আমাকে তিন বছরের অনার্স গ্রাজুয়েশন করতে হবে। চিত্র শিল্পে নিজের দক্ষতা ও মেধার পরিচয় দিতে হবে। এই গ্রাজুয়েশন কোর্সে আমি প্রথম শ্রেণি পেলে তবেই আমাকে এই প্যারিস কলেজ অব আর্টস এ আমাকে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হবে। এইসব প্রশিক্ষণ আর অনার্স কোর্স অধ্যয়নকালে আমি যে পরিমান স্কলারশিপ পাব তা সম্মানজনক এবং নির্ধারিত বেতনের চাইতে কোনো অংশে কম নয়।
এই ধরণের সুযোগ পাওয়া আমার জন্যে সৌভাগ্য ও ইতিবাচক বিষয়। আর নেতিবাচক বিষয়টি হচ্ছে মেধা অনুযায়ী ডিসটিংশন বা প্রথম শ্রেণি না পেলে দ্বিতীয় শ্রেণির কোনো শিল্পীর কলেজ অব আর্টস এ শিক্ষকতা করার সুযোগ নেই। তাকে এই কলেজ ছেড়ে অন্য কোথাও নিজের ভাগ্য যাচাই করতে হবে।
আমি ভবিষ্যত থেকে অনেক দূরত্বে দাঁড়িয়ে। দূর আকাশ থেকে রক্তমেঘ, দূর রুক্ষ পাহাড় থেকে কালো পাথর, ধূসর মরুভূমি থেকে রিক্ততা, অরণ্য থেকে ভালোবাসা, আর উত্তুঙ্গ সমুদ্র থেকে উত্তাল ঢেউয়ের শব্দ নিয়ে রেখায় রেখায় আমাকে আমার জীবনের মানচিত্র আঁকতে হবে শুধু এইটুকুই জানি।
[শিক্ষা নয় আনন্দ এবং আনন্দের মাধ্যমেই শিক্ষা গ্রহণ]
আমাদের শিক্ষা কোর্সের বিশজন শিক্ষার্থীর প্রথম দিনটি কাটল নিজেদের মধ্যে আলাপ, পরিচয়, হাসি, গল্প ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে। ছবি আঁকা-আঁকির জীবনে আমরা যে সকল হাস্যকর পরিস্থিতি বা দুর্ভোগের শিকার হয়েছি সবাইকে এক এক করে সেই সব গল্প বলতে হল। সবার গল্পই মজাদার, চমকপ্রদ। আমি বললাম, আমার রিকশার পেছনে শ্যামশ্রীর ছবি আঁকা নিয়ে সেই নাজেহাল অবস্থার গল্প। আমার গল্প শুনে সবার কৌতূহলী প্রশ্ন, তারপর? তারপর কী হল? সেই মেয়েটি কি তোমার ভালোবাসায় পড়ে গেল? নাকি তুমিও? সেই মেয়েটির ছবি কি তোমার কাছে আছে? নেই? যদি না থাকে তাহলে এক্ষুণি তোমার মন থেকে তোমার স্মরণ শক্তি থেকে সেই মেয়েটির ছবি এঁকে আমাদের দেখাও। আমরা বঙ্গললনার ছবি দেখতে আগ্রহী। যদি এঁকে না দেখাও তাহলে মনে করব এটা তোমার বানোয়াট গল্প।
আমি কোর্স ডিরেক্টর আর সতীর্থ শিক্ষার্থীদের চাপে পড়ে বোর্ডে একটা আর্ট পেপার পিন দিয়ে সেটে কালার পেন্সিল হাতে নিয়ে চোখ বন্ধ করে মনে করার চেষ্টা করলাম শ্যামশ্রীর হাসি হাসি মুখটি। অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখলাম তার মুখ এখনও আমার হৃদয়ের ক্যানভাসে উজ্জ্বল। আমি রঙিন রেখায় রেখায় তার মুখটি বোর্ডের ক্যানভাসে আঁকলাম ওমর আলীর কবিতার মতো। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যেই শ্যামশ্রী যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। তার চোখে যেন কৌতুক প্রশ্ন, এই, তুমি কেমন আছ? আমি ফিস ফিস করে বললাম, ভালো আছি শ্যামশ্রী, আমি ভালো আছি, তুমি ভালো থেক।
শ্যামশ্রীর ছবিটি দেখে সবাই মুগ্ধ। বঙ্গ ললনারা এত মায়াবী? এত লাবন্যময়ী?
সবার কন্ঠে যেন আফসোসের সুর, হে মশিঁয়ে তাইমুর, তোমার হৃদয়ে কি দয়ামায়া নেই, ভালোবাসা নেই? মেয়েটিকে নিষ্ঠুরের মতো একলা ফেলে তুমি পড়ে আছ এই দেশে। তোমার কি এতটুকু কষ্ট হয় না তার জন্যে? তুমি কি হৃদয়হীন?
আমি বললাম, বন্ধুগণ, ভারতে একজন বিখ্যাত উর্দু ভাষার কবি ছিলেন যার নাম মীর তকি। তিনি তার মৃত্যুকালে প্রেমিকদের জন্যে একটি উপদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন সেটা হচ্ছে, ‘আর যা কিছু হতে চাও হোয়ো, কিন্তু প্রেমিক কিছুতেই নয়’। সুতরাং আমি এখন চিত্র প্রেমিক।
আমার কথায় হাসির বন্যা বয়ে গেল।
প্রথম দিবসটি শেষ হল চিত্রশিল্প সম্পর্কিত নানা ইতিহাস, বিশেষ বিশেষ শিল্পীদের বিখ্যাত শিল্পকর্মের অন্তরালের কথা, দুঃখ-যন্ত্রণার কথা নিয়ে। কোর্স ডিরেক্টর মশিঁয়ে বের্ণার আমাদের মনে করিয়ে দিলেন শিল্পকর্ম মহৎ কিন্তু সেই শিল্পের পথ দুর্গম, কংকরময় এবং গাঢ় আর্তনাদের পথ। এই পথ আমরা কীভাবে অতিক্রম করব সে উপায় আমাদেরকেই উদ্ভাবন করতে হবে। মনে রাখতে হবে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য নির্মাণ শুধুমাত্র শিল্পীর নিজের আনন্দের জন্যে নয়। যে শিল্পকর্ম অন্যকে বিস্মিত করবে, মুগ্ধ করবে এবং দর্শককে রহস্যময়তার জালে আবদ্ধ করবে সেখানেই শিল্পীর শিল্প সৃষ্টির সার্থকতা। তবে শিল্পকে তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে জটিল ও দুর্বোধ্য কবিতার মতো নির্মাণ করলে সে শিল্পের ভাষা আর নান্দনিকতা কেউ বুঝবে না এবং দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য। আমাদের অতীতে অভিজ্ঞতা বলে, যে শিল্পে সহজবোধ্যতা নেই, বিস্ময় নেই, কৌতূহল নেই তা হয়ে যায় ধূলি ধূসরিত জঞ্জাল।
পরদিন থেকে শুরু হল আমাদের প্রশিক্ষণের কার্যক্রম। রং চেনার পালা, এক রং থেকে অন্য রং মিশ্রণের জাদুকরি খেলা। চিত্রাঙ্কনে এখন তো ব্যবহৃত হয় নানা ধরণের রাসায়নিক রং। কিন্তু অতীতে কোনো রাসায়নিক রং ছিল না। প্রকৃতিই ছিল চিত্রকরদের রং এর সংগ্রহশালা। ফুল থেকে, পাতা থেকে, কয়লা ও পাথর চূর্ণ থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় রং তৈরি করা হত এবং সেইসব রং চিত্রাঙ্কনে, নক্শায় ব্যবহার করা হত। সেই সব চিত্রের রং, নক্শার রং আজও অম্লান।
আধুনিক কালে চিত্রাঙ্কনে কত রকম পদ্ধতি আর রং এর ব্যবহার চিরাচরিত তুলির পরিবর্তে শুধুমাত্র আঙুল বা নখ দিয়ে, কালো রং এর পেন্সিল দিয়েই একটি দৃশ্য চিত্র বা কয়েকটি বর্ণকে মুহূর্তেই দর্শকদের তাক লাগিয়ে অন্য ভাবনায় পরিবর্তন ও দৃশ্যমান করা যেন জাদুর খেলা মনে হয়।
আর্ট পেপারে পেন্সিলে স্কেচ, জলরং, ক্যানভাসে তেলরং, এক্রোলিক, পাথর ও কাঠ খোদাই করে ভাস্কর্য নির্মাণ ইত্যাদি নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে বিভিন্ন দেশের বেশ কয়েকজন খ্যাতনামা চিত্রকর, ভাস্কর ও অধ্যাপক রিসোর্স পারসন হিসাবে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন। প্রতিদিন সকাল ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত স্কেজুল অনুযায়ী তারা চিত্র শিল্পের বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের কুড়িজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে গল্পের মতো আলাপ আলোচনা ও মত বিনিময় করেন। কেউই শুকনো নিরস বক্তৃতা দিয়ে তাদের দায়িত্ব শেষ করেন না। আমাদের প্রাকটিকাল কাজের উপরেই বেশি গুরুত্ব দেন। আমরা আমাদের সৃজনশীল চিন্তা-ভাবনাকে ক্যানভাসে বা ভাস্কর্য নির্মাণে কীভাবে আকর্ষণীয় ও ব্যতিক্রমী করতে পারি সে বিষয়ে তারা পরামর্শ দেন, হাতে কলমে কাজ শিখতে ও সম্পন্ন করতে সাহায্য করেন। আমরা শিক্ষার্থীরা এই সকল গুণীজনের সাহচর্যে, তাদের শিক্ষাদানের পদ্ধতিতে যা শিখছি, সেই জ্ঞানলব্ধ শিক্ষাকে কীভাবে ভবিষ্যতে অন্য শিক্ষার্থীদের জন্যে প্রয়োগ করতে পারি এটাই হচ্ছে প্রশিক্ষণ কোর্সের মূল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
আমাদের প্রথম মধ্যাহ্নের কাজ হল আমাদের যার যার দেশের চিত্রকর্ম পরিচিতি। নদী, নিসর্গ, নর-নারীদের বিচিত্র জীবন আর ভালোবাসা, গ্রাম জীবনের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ উৎসব, মেলা আর খেলা। আমি আমাদের দেশের পটুয়া কামরুলের চিত্রধারার বেশ কয়েকটি ছবি আঁকলাম জল রং এ। প্রশংসিত দৃষ্টি আকর্ষণ করল সবার।
সপ্তাহের পর সপ্তাহ জুড়ে আমাদের যেন একটা কর্ম নেশার মধ্যে কাটতে থাকে। প্রশিক্ষণের স্কেজুল ও বিষয়বস্তুর নিয়ম অনুযায়ী রিসোর্স পারসনরা আমাদের কখনো কয়েকটি গ্রুপে ভাগ করেন। প্রতিটি গ্রুপ নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা, মত বিনিময় করে জলরং, তেল রং, কাঠ বা পাথর খোদাইয়ের মাধ্যমে একটা আর্ট ওয়ার্ক দৃশ্যমান করা হয় একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে। তারপর প্রতিটি গ্রুপের টিম লিডাররা তাদের সদ্য নির্মিত শিল্পকর্মের ব্যাখ্যা দেয়। তাকে নানাবিধ প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয় এবং যুক্তি ও ব্যাখ্যাকে আরো সবল করতে হয়। অধিকাংশ দিনে আমার গ্রুপের সদস্যরা আমাকেই টিম লিডারের দায়িত্ব দেয়। বিষয়টি আমি উপভোগ করি এবং নেতৃত্বদান করতে করতে আমার ভেতরে একটি আস্থার ভাব ফিরে আসে। সবশেষে কোর্স ডিরেক্টর ও রিসোর্স পারসন তাদের চুলচেরা বিশ্লেষণ ও মতামত জ্ঞাপন করেন। আমাদের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দেন। অবশ্য প্রশংসা করতেও কার্পণ্য করেন না। আমাদের কর্মদিন শেষ হয় বিকেল পাঁচটায়।
ছুটির পর আমি কোথাও বেড়াতে যাই না। জুলিয়াঁকে অনুরোধ করেছি এই প্রশিক্ষণকালে আমার এখানে না আসতে। লাইব্রেরি থেকে অসংখ্য চিত্রকলা ও ভাস্কর্য বিষয়ক সচিত্র বইপত্র আমি ধার করে আনি। রাতভর সেগুলো পড়ি এবং দেখি। চিত্রকলার আদি ও বর্তমান সব ইতিহাস আমি মনের মধ্যে গেঁথে নেবার চেষ্টা করি। চিত্রকলা সম্পর্কিত বিশাল সমুদ্র পাড়ি দেবার ক্ষমতা আমার নেই। আমি শুধু বেলাভূমিতে নিউটনের মতো পাথর কুড়োতে কুড়োতে হারিয়ে যেতে থাকি। পথ খুঁজতে থাকি। বড় দুঃশ্চিন্তায় থাকি কাল আমার জন্যে কী অ্যাসাইনমেন্ট? কোন পদ্ধতিতে সেটা সম্পন্ন করব, কীভাবে সেটা প্রেজেন্ট করব? কী ব্যাখ্যা দেব? সব ভাবনা, প্রশ্ন, উত্তর আমার মাথার মধ্যে যেন জটাজাল পাকিয়ে যায়। আমি ঘুমুতে পারি না। রাতভর শূন্য শয্যায় আমি ডানা ভাঙা পাখির মতো দাপাদাপি করতে থাকি।

 

চারটি সপ্তাহ ধরে অসীম ধৈর্য্য ও কঠোর পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে প্রাচীন ও আধুনিক শিল্প সভ্যতার বিবর্তন ও ক্রমবিকাশ সম্পর্কে আমাদের কতকিছু জানা এবং বুড়ি ছোঁয়ার মতো কিছু শেখা। এই জানা ও শেখার কোনো শেষ নেই। শিখে যেতেই হবে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। কিন্তু আমাদের প্রশিক্ষণ কোর্সের সময় সীমিত। কিন্তু প্রশিক্ষণের মাত্রা ও চাপ বাড়ছে ক্রমাগত। কোর্সটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তো সমাপ্ত করতেই হবে। শেষ দিনটি হবে আমাদের নিজ নিজ ভাবনা-চিন্তা অনুযায়ী যে কোনো মাধ্যমে চিত্র ও ভাস্কর্য প্রদর্শন।
সমাপ্তি দিনের তিন দিন আগের এক শুক্রবার বিকেলের কথা। আমি ছুটির পর ডরমিটরিতে আমার কক্ষের বন্ধ দরজার সামনে দেখি সুদৃশ্য লেদার কভারে আবৃত একটি বেহালা এবং এক গুচ্ছ ফুল। বেহালার সঙ্গে রঙিন ফিতা দিয়ে সংযুক্ত একটি বড় কার্ড। তাতে লেখা-এ স্মল গিফট ফ্রম সোফি। কার্ডে নিজের হাতে ইংরেজিতে লেখা,
‘প্রিয় বন্ধু, আজ মধ্যরাতেই আমি প্যারিস ত্যাগ করছি। আমেরিকার শিকাগো ইউনিভার্সিটিতে আমি জার্নালিজম অ্যান্ড কম্যুনিকেশনে একটি স্কলারশিপ পেয়েছি। তাই এই চলে যাওয়া। নাটকীয়ভাবে তোমার কাছ থেকে আমার বিদায় নেবার ইচ্ছে নেই। তাই নীরবে বিদায় নেবার আগে তোমার জন্যে রেখে গেলাম একটি বেহালা যা ছিল তোমার আকাংখা, আর রেখে গেলাম একগুচ্ছ ফুল যা ছিল আমার আকাক্সক্ষা। ভালো থেকো প্রিয় বন্ধু।’
আমি বেহালা আর ফুল হাতে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলাম।
শনি ও রবিবার ছুটি। কিন্তু আমাদের ছুটি নেই। এই দুটো দিনের মধ্যে যার যার চিন্তা-ভাবনা অনুযায়ী যে কোনো মাধ্যমে ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য নির্মাণ করতে হবে এবং সোমবার ফাইনাল প্রজেক্ট হিসাবে তা প্রদর্শন ও ব্যাখ্যা দিতে হবে। এই ফাইনাল প্রজেক্ট দর্শন ও বিচার বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করবেন আর্ট কলেজের কিছু অধ্যাপক এবং আমন্ত্রিত রিসোর্স পারসনগণ।
আমি কী ছবি আঁকব, জলরং এ নাকি তেল রং এ তা এখনও ঠিক করিনি। মাথায় অনেক আইডিয়ার জটাজাল। কিন্তু সব জট ছাড়িয়ে যে কোনো একটি সহজ সরল ছবি আঁকতে হবে শুধু এইটুকুই জানি। আমার মাথাটা এখন পরিষ্কার রাখা দরকার।
আমি সোফির ভায়োলিনটা কাভার খুলে দেখলাম। ঝকঝকে নতুন ভায়োলিন। ছড় টেনে বাজাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে সেটা বেসুরে বেজে উঠল। আমি চোখ বন্ধ করে সেই অন্ধ বেহালা বাদকের কথা চিন্তা করলাম। স্মরণ করলাম তার ভায়োলিনে ছড় টানার কলা-কৌশল আর আঙুলের খেলা। তারপর অন্ধের মতোই বাজালাম পদ্মার ঢেউরে গানটি। মনে হল আমি বোধহয় কিছুটা পারছি। এরপর আবার বাজাতে চেষ্টা করলাম লালনের সেই বিখ্যাত গানটিযে জন গুরুর ভাব জানে না। গানটি ছন্দময়, সুরেলা, তালের গান। আমি আমার ফাইনাল প্রজেক্টের ছবির কথা ভুলে রাতভর এই দুটি গানই বেহালায় বাজাতে থাকলাম। শেষ রাত্রে মনে হল হ্যাঁ, সোফির দেওয়া এই বেহালার তারে, সুরে প্রথম আমার মনের কথা, হাতের কথা শুনতে পাচ্ছি। সোফির মুখটি মনে করে বেহালায় একটি চুমু দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত মনে ঘুমিয়ে গেলাম ... এই একটি মাসের মধ্যে এই প্রথম শান্তির ঘুম।
ছুটির শনি ও রবিবার
শনি ও রবি এই দুটো দিন আমি অবিশ্রান্ত পরিশ্রমে দুটি ছবি এঁকেছি। একটি আর্ট পেপারে জল রংএ। অন্যটি ক্যানভাসে তেল রং এ। যদিও প্রত্যেকের একটি করে ছবি আঁকার কথা আমি সে নিয়ম ভঙ্গ করেই দুটি ছবি আঁকলাম কেননা একটি ছবি আর একটি ছবির সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। যদি অনুমতি পাই তবে দুটি ছবিই প্রদর্শন করব। না পেলে একটি।
ছবি দুটি আঁকতে আঁকতে আমি যখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছি তখন হানাদার ক্লান্তির শিকারী বিড়াল তাড়াতে বেহালা বাজিয়েছি আমার ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা কিছু পুরাতন অথচ চিরকালের ভালোবাসার গান, ঝড় উঠেছে বাউল বাতাস, গানে মোর ইন্দ্রধনু, তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার, এই রাত তোমার আমার, অলির কথা শুনে বকুল হাসে, একি সোনার আলোয় জীবন ভরিয়ে দিলে ...। বেহালার তারে, সুরে আমি আমার মৃত বাসনার, মৃত ভালোবাসার গানগুলি গাইতে থাকলাম।
সোমবার
আজ সোমবার। আমরা সবাই যার যার ছবি নিয়ে বিশেষভাবে সজ্জিত আর্ট গ্যালারিতে। সম্মানিত বিচারকমন্ডলী ও বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ উপস্থিত। তাদের মধ্যে আছেন মশিঁয়ে আতোঁয়ান। আমি ওদের দেখে কিছুটা নার্ভাস। ওরা আজ আমার ভাগ্য-নিয়ন্তা। আমি আল্লাহকে ডাকলাম। স্মরণ করলাম বাবার মুখ, জয়ী মা’র মুখ। মনে মনে বললাম, জানি আমি বড় পাপী, তবু তোমরা আমাকে ক্ষমা কর। আমাকে শক্তি দাও।
আজকের ফাইনাল প্রেজেন্টেশনে আমি শুধু ছবি দুটিই আনিনি। সঙ্গে নিয়ে এসেছি আমার বেহালাটিও। আমার সুপ্ত ইচ্ছে আমার বেহালাটিও আমার সঙ্গে কথা বলবে। আজ আমি মরীয়া। হয় আজ আমি বরবাদ হয়ে যাব, অথবা বিজয়ী হব। কিন্তু আমার বুকের ভেতর ভয়, ধুপ ধুপ ... শুনতে পাচ্ছি ধান ভানার গান, যেন কোনো গৃহ বধূর অবিরাম ঢেঁকি পাড়ানির শব্দ, ধুম ধুম আওয়াজ। আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যেও দেখলাম মাদাম জুলিয়াঁকে। কথা হল না। দৃষ্টি বিনিময় হল। তার দৃষ্টিতে যেন আশ্বাস আর অভয়দান।
করতালিতে মুখর শব্দের মধ্যেই এক এক করে ছবি প্রদর্শনী শুরু হল। অনুষ্ঠানের সঞ্চালককে আমি আগেই অনুরোধ করে রেখেছিলাম সর্বশেষে যেন আমাকে আহ্বান করা হয় আমার ছবি প্রদর্শনের। সঞ্চালক আমার অনুরোধ রক্ষা করেছেন।
ফাইনাল প্রজেক্টে সর্বমোট বিশজন শিক্ষার্থীর নাম ধরে ধরে তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি প্রদান করে সঞ্চালক আহ্বান জানালেন ছবি এবং ভাস্কর্য প্রদর্শনের। ক্রমিক নম্বর অনুযায়ী আমন্ত্রিত শিক্ষার্থীরা একে একে তাদের ছবি প্রদর্শন শুরু করলেন। আমার দৃষ্টিতে প্রতিটি ছবিই অসাধারণ, অভাবনীয় চিন্তাধারার। প্রশংসা আর করতালিতে মুখরিত হল ঘর, আর্ট গ্যালারি। এদের ছবির সঙ্গে আমার এখনও অপ্রদর্শিত ছবি তুলনামূলক বিচারে নিজেকে বড় দৈন্য মনে হল। শিল্পের মানদন্ডে আমার পক্ষে কোনোমতেই সম্ভব নয় এদেরকে টপকে যাওয়া। ওদের ছবি দেখে সবার সঙ্গে হাততালি দিচ্ছি। কিন্তু মন বিষন্ন। সিদ্ধান্ত নিলাম যদি আমি উত্তীর্ণ না হতে পারি তাহলে প্যারিসকে বিদায় জানিয়ৈ আমি দেশে ফিরে যাব। বিদায় প্যারিস।

সর্বশেষে আমাকে আমন্ত্রণ। আমার এক হাতে দুটি ছবির মোড়ক, আর এক হাতে বেহালা।
আমি জলরংএ আঁকা ছবিটি স্ট্যান্ডের বোর্ডে পিনবদ্ধ করলাম। অ্যাবস্ট্র্যাক্ট ও সেমি অ্যাবস্ট্র্যাক্ট পদ্ধতির মিশ্রণে একটি বিষণ্ন নারীর জল টলমল বিশাল চোখ যেন পদ্মদিঘি। সেই জলটল চোখের ভেতর এক অন্ধ বেহালাবাদক বেহালা বাজাচেছ। মনে হচ্ছে ঐ নারীর চোখের জল এক্ষুণি গড়িয়ে পড়বে, আর আমি যেন বেহালা বাদক নিমেষেই ডুবে যাব চোখের দিঘি জলে।
সবাই অবাক দৃষ্টিতে ছবির দিকে তাকিয়ে। হলে পিন পতন নিস্তব্ধতা। আমি বেহালাটা হাতে নিলাম। ছবির পাশে বেহালা হাতে অন্ধ বেহালা বাদকের মতোই দাঁড়িয়ে আছি ভাবছি আমি এখন কোন সুরে বেহালা বাজাব? আমার যে কিছুই মনে পড়ছে না। আমার চোখের সামনে এখন সবকিছুই অস্পষ্ট। সব দৃশ্যই অদৃশ্য। কোনো গানের কথাই মনে পড়ছে না। শ্যামশ্রীর চোখ যেন আমার বুকের ভেতরে কথা বলে উঠল, আমার চোখের দিকে তাকাও। আমার যত কষ্ট, যত দুঃখ, চোখের যত জল সবই তো তুমি দিয়েছ। এখন বেহালা হাতে কেন নিঃশব্দ, তন্ময়? হে বাদক, বাজাও, বাজাও তোমার বেহালা। আমাকে যদি পোড়াতে ভালো লাগে আরো পোড়াও আমাকে যদি কাঁদাতে ভালো লাগে আরো কাঁদাও ... কাঁদাও হে শিল্পী, কাঁদাও ...
বেহালায় আমার অজান্তেই যেন বেজে উঠল বশির আহমেদের কণ্ঠে খান আতাউর রহমানের একটি গানের বিষণ্ন কথা, ‘আমাকে পোড়াতে যদি এত লাগে ভালো, জ্বালো আগুন আরো জ্বালো, ঢালো আরো ব্যথা ঢালো।’ আমি অন্ধের মতোই সেই গান গাইলাম আর বাজালাম। যখন গান আর বাদন শেষ হল তখন আমার চোখে পানি। অন্যরাও নিস্তব্ধ। তারা আমার কন্ঠের মাধুর্য তাদের হৃদয় বোধহয় ছুঁয়ে গেছে। তাদেরও কারো কারো চোখ ছলছল। আমার জন্যে কোনো করতালি নেই, উচ্ছ্বাসের শব্দ নেই। বুঝতে পারলাম আমি পরাজিত।
আমি মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কয়েক মুহূর্ত পরে মুখ তুলে বললাম, শ্রদ্ধেয় সুধীম-লী, আমি একজন সামান্য রিক্শ পেইন্টার থেকে শিল্পী হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা বোধহয় পারলাম না। আসলে মানুষের কোনো আশাই পূর্ণ হয় না যদি পথ না দেখা যায়। আমি জীবনে এত কষ্ট পেয়েছি সেই কষ্টটাকে একটি নারীর চোখের টলমল জলের ভেতর দিয়ে উজাড় করে দিতে চেয়েছি। ঐ নারীর চোখের জলের ভেতর যে অন্ধ বেহালা বাদক সে আমি। আমি এক অন্ধ ব্যর্থ বেহালা বাদক। আমাকে ক্ষমা করবেন।
আমি সরে যাবার উপক্রম করতেই একজন বিচারক বলে উঠলেন, থামো হে যুবক। আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে নারীর চোখে জলটলমল, সেই চোখের জল যেন এক্ষুণি গড়িয়ে পড়বে। আর তুমিও ডুবে যাবে তার জলের অতলে। কিন্তু জলটা পড়ি পড়ি করেও পড়ছে না। কেন পড়ছে না?
আমি বললাম, আমি যে তাকে আমার হৃদয় উজাড় করে স্বর্গের পাখির মতো আমার বিরহ বেদনার গান শুনিয়েছি, আমার বিষণ্ন যত সুর এই বেহালায় উজাড় করে ঢেলে দিয়েছি। তাই আমি এখনও স্থির তার চোখের জলে, তার হৃদয়ে, তার স্মৃতিতে।
অন্য একজন বিচারক বললেন, তুমি যে গান গেয়েছ তার ভাষা আমরা বুঝিনি। কিন্তু তোমার কন্ঠ আর বেহালার সুর আমাদের হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ঐ নারীর চোখের জল শুধু তার চোখে নয়, আমাদের হৃদয়েও, আমাদের চোখেও কষ্ট দিচ্ছে। শুনে রাখো যুবক, বিষন্ন বেদনার কথায় কেউ আনন্দে করতালি দেয় না, শিস বাজিয়ে হল মুখরিত করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে না। আমরাও তা করিনি। তুমি বোধ হয় দুটি ছবি এনেছ। আমরা তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি দ্বিতীয় ছবিটি প্রদর্শন করতে।
আমি ক্যানভাসে তেল রং এ আঁকা দ্বিতীয় ছবিটি বোর্ডে প্রথম ছবির উপরেই পিন বন্ধ করলাম। ছবিটির বিষয়বস্তু হচ্ছে অন্ধ বেহালা বাদক এক অন্ধকার গলি পথে শরীর দুলিয়ে বেহালা বাজাচ্ছে। তার বেহালা বাদকের সুরে এক কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারী তার রোগ যন্ত্রণা ভুলে পঙ্গু হাত, বিকৃত মুখ নিয়ে সেই গানের তালে তালে নাচছে। অন্ধকার পটভূমিতে তাদের চোখে মুখে, দেহের ওপর যৎসামান্য নীল আলো। সেই নীল আলোটিই তাদের হৃদয় থেকে উৎসারিত আনন্দ ও নৃত্য ছন্দ।
আমি হাতে বেহালা তুলে নিলাম। বললাম, এই ছবির কথা আমার কন্ঠের গান আর বেহালা বাদনের মধ্য দিয়েই প্রকাশের অনুমতি দিন। যে গানে সুর আছে সে গানের ভাষা কোনো প্রতিবন্ধকতা নয়।
আমি আমার হাতের বেহালায় প্রথমে সুর তুললাম, ‘যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নেই লেনা দেনা। যে জন গুরুর ভাব জানে না ....’
এটি আমাদের দেশের এক প্রাচীন বাউল লালন সাঁইয়ের বিখ্যাত গান। আধ্যাত্মবাদের গান। এখানে বিষণœতা নেই। আছে মরমী কথা। এটি এমন একটি গান যে গান শুনলে শরীর এমনি এমনিই দুলে উঠবে, কথা, গানের সুর ছুঁয়ে যাবে হৃদয়। আমি বেহালা বাজাতে বাজাতেই গানটির সার কথা ইংরেজি অনুবাদের ভঙ্গিতে সুরের তালে তালে বললাম, তারপর বেহালা বাদনের সাথেই বাউল নৃত্যের দেহ ভঙিমায় মূল বাংলায় গান গাইতে শুরু করলাম নিজেকে উজাড় করে দিয়ে। আমি ‘ভাব’ কথার পরিবর্তে প্রেম কথাটি বসালাম ছবির বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল রাখতে। বাজাতে বাজতে কখনও দর্শকদের সম্মুখে যাই, কখনো বিচারকম-লীর সম্মুখে যাই। দেখলাম ওরাও যেন সুরের তালে তালে গানের ঝংকারে বসে বসেই শরীর দোলাচ্ছেন, মাথা দোলাচ্ছেন, তাল ঠুকছেন। তারাও ক্রমাগত ডুবে যাচ্ছেন লালনের গানে আমার কন্ঠের ভেতর দিয়ে আর হাতের বেহালার সুরে।
আমার গান বেহালা বাদন শেষে হল ভর্তি দর্শকদের উচ্ছ্বসিত করতালি। আমার বুকের ভেতরেও নদীর প্রবল স্রোতের মতো সেই শব্দের ধ্বনি, প্রতিধ্বনি এবং আনন্দ। আজি আমি হারি বা জিতি তাতে কিচ্ছু আসে যায় না। কিন্তু আমি একেবারে ব্যর্থ নই। আমি পেরেছি, দর্শকদের মুগ্ধ করতে পেরেছি।
উচ্ছ্বাসধ্বনি এবং হাততালি শেষে একজন অধ্যাপক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, লালন সাঁইয়ের এই আধ্যাত্মিক বা মরমী গানের সাথে এই অন্ধ বেহালা বাদক আর কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারীর সম্পর্ক কী?
আমি বললাম, ভালোবাসা। অন্ধ বেহালা বাদক জানে যে নারীর সম্মুখে সে তার বেহালা বাজিয়ে আনন্দ দিচ্ছে সে একজন কুষ্ঠ রোগী। আর কুষ্ঠ রোগীনিরও আনন্দ তাকে কুষ্ঠরোগী জেনেও অন্ধ বাদক তাকে ভালোবাসার গানে আনন্দ দিচ্ছে। এখানে শরীরের সাথে শরীরের সম্পর্ক নয়, সম্পর্ক হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের। যেমন সম্পর্ক আমাদের আত্মার সাথে পরমাত্মার। আমরা তো ঈশ্বরকে চোখে দেখি না, তবুও আমরা আমাদের সব পাপ, পূন্য, ভুল-ভ্রান্তি নিয়ে তার কাছেই সমর্পিত। আর এই আত্ম-নিবেদন কিংবা সমর্পণটা তখনই পূর্ণ হয় যখন মানুষ তার অন্তর্গত ভাব-ভালোবাসাকে উপলব্ধি করতে শেখে, ভালোবাসতে শেখে।
আর একজন বিচারকের প্রশ্ন, তাহলে ভালোবাসা কি অন্ধ বাদকের মতো অন্ধ? ভালোবাসা কি কুষ্ঠ রোগীদের মতো বিকৃত? বিকলাঙ্গ?
এ ধরণের প্রশ্নে আমি বিপাকে পড়লেও তা বুঝতে দিলাম না। বললাম, ভালোবাসা অন্ধ নয়, কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত বিকলাঙ্গ নারীও নয়। আমি তো আগেই বলেছি ভালোবাসা দেহের সঙ্গে দেহের সম্পর্ক নয়, ভালোবাসা হৃদয়ের সাথে হৃদয়ের, আত্মার সাথে পরমাত্মার। আমার ছবিতে এই দুই নর-নারী প্রতিকী চরিত্র মাত্র। আমি বিজ্ঞ সুধীজনের কাছে একটিমাত্র প্রশ্ন করতে চাই, আমার চিত্রে এই অন্ধ বাদক আর কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত নারীর ভালোবাসার আনন্দ নৃত্য দেখে আপনাদের হৃদয়ে কি ঘৃণার সৃষ্টি হচ্ছে নাকি ওদের জন্যে মায়া মমতার সৃষ্টি হচ্ছে?
বিচারকমন্ডলী কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলেন। তারপর প্রশ্নকারী বিচারক বলে উঠলেন, না ঘৃণা নয়, আমি ভালোবাসাই অনুভব করছি। ঈশ্বর সবার হৃদয়ে যেন এমনই ভালোবাসার বোধ তৈরি করে দেন। আমার আর কোনো প্রশ্ন নেই। ধন্যবাদ মশিঁয়ে তাইমুর। চিত্র শিল্পী হিসাবে আপনি বেঁচে থাকুন সবার হৃদয়ে, সবার ভালোবাসায়।
আবার প্রচন্ড করতালি নয়, যেন তুমুল বৃষ্টিপাতের শব্দে আমি ডুবে গেলাম।
অভিনন্দনে অভিনন্দনে আমরা বিশজন শিক্ষার্থীই সিক্ত। বিচারকম-লীর বিচার-বিশ্লেষণ আর চূড়ান্ত রায়ে গত এক মাসের পারফরমেন্স আর প্রেজেন্টেশনে আমরা সবাই ডিসটিংশন পেয়েছি। আর আমিই আজকের বেস্ট পারফর্মার অ্যান্ড প্রেজেন্টার। আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের প্রত্যেককেই সার্টিফিকেট অব মেরিট অর্থাৎ সনদ দেওয়া হল।
এরপর বিশাল পানোৎসবের আয়োজন। সেখানে সবার সঙ্গে সবার হাতের মিলন, আলিঙ্গন ও হৃদয়ের মিলন। প্রশংসায় আমরা আপ্লুত। জুলিয়াঁ ছুটে এসে হঠাৎ আমাকে জড়িয়ে ধরল এবং তার দীর্ঘ চুম্বনে আমি বিব্রত। আলবার্ট নামের একজন সতীর্থ সরস মন্তব্য ছুঁড়ে দিল, হোয়াট এ লাকি গাই! এ লং কিস ফ্রম এ বিউটিফুল ফেয়ারি ইজ বেটার দ্যান অ্যান আওয়ার্ড। আই উইশ আই কুড হ্যাভ দ্যাট।
আলবার্টের কথা শুনে জুলিয়াঁ আমাকে ছেড়ে দিয়ে তার দিকে এগিয়ে গেল। আলবার্টের মুখভর্তি দাড়ি, গোঁফ। একরাশ গোঁফের আড়ালে তার ঠোঁট অদৃশ্য। জুলিয়াঁ তার সামনে দাঁড়িয়ে তাকে নিরীক্ষণ করল। রসিকতার কন্ঠেই বলল, হে গাই ইয়োর ফেস ফুল অব বিয়ারদেদ অ্যান্দ লাউজি মাউসতাস। আই দোন্ত সি এনি লিপ অর প্লেস তু কিস। সো গিভ মি ইয়োর আর্তিস্তিক হ্যান্দ আই উইল কিস অন দ্যাত।
আলবার্ট হাসতে হাসতে বলল, স্যরি মাদাম। মাই হ্যান্ড ইজ অনলি ফর মাই পেইন্টিং ব্রাশ। ইফ ইউ রিয়েলি ওয়ান্ট টু কিস মি দেন ইউ উইল হ্যাভ টু ফাইন্ড আউট মাই লিপ।
জুলিয়াঁ হেসে বলল, নত দিস তাইম। ওয়েত ফর নেক্সত তাইম। কাম তু মি অ্যাজ এ ক্লিন শেভদ ম্যান। ইউ উইল গেত ইত।

ওদের কথাবার্তার মধ্যেই মশিঁয়ে আতোঁয়ান আর মশিঁয়ে দানিয়েল এলেন। দুজনেই উষ্ণ করমর্দনে আমাকে অভিনন্দিত করলেন। বললেন, এক্সসেলেন্তে! এক্সসেলেন্তে! জানতাম, তুমি শুধুমাত্র চিত্র শিল্পী। কিন্তু তুমি যে এমন চমৎকার কণ্ঠশিল্পী, আর বেহালাবাদক তা আমাদের জানা ছিল না। ইউ হ্যাভ গিভেন আস এ বিগ সারপ্রাইজ। উই আর ভেরি হ্যাপি। নাউ ইউ উইল গেট হোয়াট ইউ ওয়ান্টেড।
আমি সকৃতজ্ঞ চিত্তে বললাম, মেখসি, মেখসি মশিঁয়ে। থ্যাংক ইউ স্যার।
বিকেলের এই পার্টিতে সবার অনুরোধে আমাকে বেহালা বাজিয়ে গান গাইতে হবে। আমি ইংরেজি ভাষার বা ফ্রেন্স ভাষার কোনো গান জানি না এমন আপত্তি সত্ত্বেও আমাকে বাধ্য হয়েই আমার বেহালা বাদনের সঙ্গে পুরোনো বাংলা গান-পদ্মার ঢেউরে, মোর শূন্য পদ্ম হৃদয় নিয়ে যা, যারে। আমার কন্ঠ আব্বাসউদ্দিন বা আব্দুল আলিমের মতো পরিশীলিত কন্ঠ নয়। তবুও আমি প্রাণখোলা কন্ঠেই গাইলাম। কন্ঠ, সুর বেহালা বাদন পদ্মার ঢেউয়ের মতোই বোধহয় সবার উপর দিয়ে বয়ে গেল।
আবার অনুরোধ আসল আরো একটি গান গাইবার। কিন্তু বিদেশি অতিথিদের এই সমাবেশে বাংলা আর কী গান গাইব? এখন এই মুহূর্তে বাংলা করুণ, বিষণœ গান ভাষাগত কারণে কারো মন ছুঁয়ে যাবে না। এই পার্টিতে এই মুহূর্তে সবাইকে উন্মাতাল করার মতো গান গাইতে হবে। কিন্তু কী গান গাইব চট্ করে মনে পড়ল বাংলাদেশের তরুণ সম্প্রদায়ের সবচাইতে জনপ্রিয় গায়ক আজম খানের গাওয়া একটি মহাতালের মন মাতানো গানঅসম্ভব জনপ্রিয় গান“আলাল ও দুলাল, তাদের বাবা হাজি চান, চানখাঁ পুলে প্যাডেল মেরে পৌঁছে বাড়ি আলাল ও দুলাল।”বেহালা বাদনের সঙ্গে গানের মুখটি গাইবার সঙ্গে সঙ্গে সবাই তালে তালে নাচা শুরু করল। সুর আর তালের সঙ্গে যার যেমন খুশি নাচ। আমি বার বার ঐ একই গান ঘুরে ফিরে গাইতে লাগলাম যতক্ষণ না পর্যন্ত আমি ক্লান্ত হলাম। নৃত্য, গান, শ্যাম্পেন, হুইস্কি, রেড ওয়াইনের মহোৎসব চলল। কয়েকজন আমাকে ধরে ছুঁড়ে দিতে লাগল শূন্যে, মহানন্দে-আর ওরা ওদের মতোই তালে তালে গাইতে লাগল-আলাল ও দুলাল ......।
এমনি করেই আমার একটি শ্রেষ্ঠ দিনের সমাপ্তি ঘটল।
উৎসব, আনন্দ শেষে জুলিয়াঁ আমাকে পাকড়াও করল। তার আবদার আমি আজ তার রাত্রের অতিথি। আমাকে সে মার্সেইতে নিয়ে যাবেই।
আমি জোড় হাতে তার কাছে ক্ষমা চাইলাম। বললাম, জুঁলি গত তিন দিন ধরে আমার বিশ্রাম নেই, ঘুম নেই। আমি ভীষণ ক্লান্ত। আমাকে ক্ষমা কর।
জুলিয়াঁ মনক্ষুন্ন হয়ে চলে গেল।
যদিও আমার শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। তবুও আমি বেহালাটি কাঁধে ঝুলিয়ে পথে বেরুলাম। একটি ট্যাক্সি নিয়ে পথে পথে খুঁজতে লাগলাম সেই অন্ধ বেহালা বাদককে। খুঁজতে খুঁজতে তাকে পেয়েও গেলাম পথের মোড়ে। আমি ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়ে আস্তে আস্তে তার কাছে এগিয়ে গেলাম। বেহালাটি বের করে তারে ছড়া টানলাম, লালনের সেই গানের সুরে যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা ...।
অন্ধ বাদক প্রথমে সামান্য চমকে গেলেও হেসে উঠল। বলল, যুবক তুমি শেষ পর্যন্ত বেহালা কিনেছ?
আমি বললাম, না। আমাকে এটা আমার বন্ধু উপহার দিয়েছে।
অন্ধ বাদক বলল, বন্ধুর উপহার ভালোবাসার উপহার। এটি সযতেœ ব্যবহার কোরো।
আমি বললাম, হ্যাঁ তা-ই করব। তুমি আমার বেহালাটিতে ছড় টেনে সুরে উদ্বোধন করে দাও।
অন্ধ বাদকের বিস্মিত প্রশ্ন, কেন আমি কেন? আমি তো একজন সামান্য ভিক্ষুক।
আমি বললাম, তুমি বেহালা বাদনে সুরের রাজা। তুমি আমার শিক্ষা গুরু। আমি তোমার সুরের ভিক্ষুক।
হা হা করে হেসে উঠল অন্ধ বাদক। তারপর আমার হাত থেকে বেহালাটি নিয়ে অপূর্ব সুরে বাজাল লালনের সেই গানটি যে জন গুরুর ভাব জানে না তার সঙ্গে নাই লেনা দেনা ...।
আজ ছবি প্রদর্শনী অনুষ্ঠানে আমি এই গানটি অপুট হাতে যেভাবে বাজিয়েছিলাম তার চাইতে আরো মাতোয়ারা এই অন্ধ বাদকের বাদন। এ যেন তার হৃদয় থেকে উৎসারিত আনন্দ, আরো ছন্দময়, গতিময়।
চলবে

চলবে

 

লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব এক)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব দুই)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব তিন)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব পাঁচ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব ছয়)
লাইফ অব এ রিকশা পেইন্টার (পর্ব সাত)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব আট)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব নয়)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব দশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব এগার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব বার)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব তের)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব চৌদ্দ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব পনের)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব ষোল)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব সতের)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব আঠারো)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব উনিশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব বিশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব একুশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব বাইশ)
লাইফ অব এ রিক্শ পেইন্টার (পর্ব তেইশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top