সিডনী সোমবার, ১২ই এপ্রিল ২০২১, ২৯শে চৈত্র ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটাশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১২:৪১

আপডেট:
২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১ ১৩:৪৭

ছবিঃ অমর মিত্র

 

আটাশ

উতঙ্কের চাহনিতে হিম বর্ষণ হয় যেন। উতঙ্কর রথটিও তেমনই। ভয় উদ্রেক করে রাজপথে সব সময়। উতঙ্কর রথ কে না চেনে এই নগরে? পথের সারমেয়কূল সবচেয়ে ভাল চেনে। প্রভুকে নিয়ে উতঙ্কের রথ যখন রাজপথে আচমকা নেমে আসে ঘূর্ণীবায়ুর মতো, সারমেয় দল আর্তনাদ করতে করতে দিগ্বিদিক জ্ঞানহারা হয়ে ধাবমান হয় এদিক-ওদিকে। তারা যেন রথ এসে পড়ার আগেই টের পায় আসছে। সিন্ধু দেশের ঘোড়া আর তার সারথি, ঘূর্ণমান চাকা। ওই রথ যে কত সারমেয়কে পঙ্গু করেছে। সুভগ দত্ত রথের এই গতি পছন্দ করেন। রাজার রথও এমন গতিময় হয় না। চলমান রথে বসে নিজ শ্রেষ্ঠত্ব অনুভবে যে আনন্দ শ্ৰেষ্ঠীর তা আজ নেই, তিনি অস্পষ্ট স্বরে নিবৃত্ত করলেন সারথিকে, উতঙ্ক ধীরে।

সিন্ধু দেশের অশ্বের মতোই উতঙ্ক গ্রীবা বাঁকিয়ে প্রভুর দিকে তাকায়। তিনি ঘাড় হেঁট করে বসে আছেন। প্রভু বিমর্য। যে ক্রোধে তিনি ডাক দিয়েছিলেন উতঙ্ককে তা এখন আর নেই। উতঙ্ক ঠিক ধরতে পারছে না কী হয়েছে এমন যে ক্রোধ আর অবসন্নতা দুইই ছেয়ে থাকবে প্রভুকে। হাটুরে মানুষটি চলে যাওয়ার পর এমন হলো। প্রভু বলেননি তাই সে ওই বৃদ্ধকে আটক করেনি। আর মানুষটি অতি নিরীহ, ওকে চেনে উতঙ্ক। সে ধ্রুবপুত্রকে যে চিনত। লোকটি চলে যাওয়ার পর অস্থির হয়ে গেছেন প্রভু সুভগ দত্ত। যেন আরো বৃদ্ধ হয়ে গেছেন। অলঙ্কারগুলি কার, কেন এনেছিল লোকটি? উতঙ্ক দেখল শ্রেষ্ঠী ঝুঁকে বসে আছেন।

সুভগ দত্ত নিশ্চুপ। তার মাথার উপর পীতবর্ণের চাঁদোয়া। বস্ত্রটির চারদিকে সূক্ষ্মতন্তুর ঝালর। চাঁদোয়ার উপর চৈত্রের ধারালো রোদ। সূক্ষ্মতন্তু আড়াল করতে পারছে না উত্তাপকে। চুঁইয়ে চুঁইয়ে তাপ নামছে শ্রেষ্ঠীর দেহে। পীতবর্ণের আলো ছেয়ে আছে তাঁকে। প্রভুর বিষন্ন মুখখানিতে বিমর্ষ হলো উতঙ্ক। প্রভুকে এমন তো দ্যাখে না সে সচরাচর। কতদিন বাণিজ্যে যাননি প্রভু। বাণিজ্যে গেলে উতঙ্ক সঙ্গে থাকে। কত লোকজন, গো শকট, জিনিসপত্র, খাঁচায় কবুতর, ময়ূর, দাস-দাসী নিয়ে প্রভু চলেন বাণিজ্য পথে। বাণিজ্য করতে গিয়েই উতঙ্ককে তিনি নিয়ে এসেছিলেন উত্তর-পূর্ব দেশ থেকে। আবছা মনে পড়ে উতঙ্কর। শীতের সময় তুষার ছেয়ে থাকত চারদিক। আকাশে শাদা মেঘের পুঞ্জ দেখলে সেই দেশের কথা মনে পড়ে তার। তাকে সংগ্রহ করে কত দেশ না ঘুরে উজ্জয়িনীতে এসে থেমেছিলেন সুভগ দণ্ড। পথে নেমেছিল ঘোর বর্ষা। বর্ষারম্ভের পূর্বেই পৌঁছে যাওয়ার কথা ছিল। হয়নি। প্রভুর কি বাণিজ্যের কথা মনে নেই? মনে নেই পূর্ব-সমুদ্রের কথা? সেই দেশের মাটি কোমল, গাছগাছালি ঘন বনানীতে পরিপূর্ণ স্থলভাগ, নদীতীর। সেই দেশ থেকে নারিকেল আর ধান্য আনা হয়েছিল। প্ৰভু কেন বাণিজ্য ভুলে নিতান্ত এক বালক ধ্রুবপুত্রের সঙ্গে মেতে উঠলেন প্রেমের দ্বন্দ্বে। প্রভু যদি ইচ্ছা করেন কোন নারী তাঁকে এড়িয়ে থাকতে পারে? দেবদত্তাকে গণিকালয় থেকে অপহরণ করে প্রভু গৃহে নিয়ে আসতে কত সময়? প্রভু আদেশ করুন।

উতঙ্কর চোখের মণিতে প্রভুর দুঃখ ছায়া ফেলল। শ্রেষ্ঠীর কাছে তার বেড়ে ওঠা, শ্রেষ্ঠীর সঙ্গে কত দেশ না ঘুরেছে সে। সে তার অনুগত দাস। তিনি কখন শ্বাস নেবেন, কখন নিঃশ্বাস ফেলবেন সেই খোঁজ রাখাও যেন তার কর্তব্য। সে তা পালন করে।

ঘোড়া দুটির রাশ টেনে ধরল উতঙ্ক। এই রথটি পারিযানিক হলেও আসলে এটি যুদ্ধেরই রথ। দশ পুরুষ উচ্চ এবং বার পুরুষ বিস্তৃত এই রথ যুদ্ধেরই উপযোগী। উতঙ্কর খুব পছন্দ এইটি। রথের সুবৃহৎ দুটি চাকার ঘূর্ণনে, ঘর্ষণে উদ্ভূত শব্দে উতঙ্ক যেন আরো তেজময় হয়ে ওঠে। রাশে ঝাপটা দিয়ে সিন্ধু দেশের ঘোড়ার পিঠে তখন মৃদু কশাঘাত এবং বাতাসে কশ চালনার সাঁইসাঁই শব্দ রথকে গতিময় করে। যেন বা শত্রু শিবির সম্মুখে। তছনছ করে দেবে সব। এই যে ঘোড়ার গতি আবার নেমে এল রাশ টানতেই। উতঙ্ক রথ আবার থামিয়ে দিল।

সুভগ দত্ত বললেন, দেবদত্তার কাছে যেতে হবে, গণিকালয়ে।

উতঙ্ক দেখল প্রভুর দুটি চোখ রক্তবর্ণ। সে রাশে ঝাপটা মেরে অশ্বদুটিকে চঞ্চল করে তুলল। অশ্ব-পৃষ্ঠে কশাঘাতে গতি তুলল রথের চাকায়। রথ চলল বটে, গতি মন্থর, উদ্দামতা নেই। সুভগ দত্ত এবার জিজ্ঞেস করলেন বিশ্বাসঘাতিনীর শাস্তি কী?

উতঙ্ক পুনরায় গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকায়। তার ক্ষুদ্র দুটি চোখের কোলে কাজল টানা। কী গভীর মায়াবী চাহনি। প্রভুর বেদনা বুঝি তাকে ছুঁয়েছে। বিষণ্ণতা তার মুখমণ্ডলে যেন সঞ্চারিত হচ্ছে। সুভগ দত্ত ধীরে ধীরে অলঙ্কারগুলির হাত বদলের কথা বলছেন। বলতে বলতে তিনি নিজেই টের পেলেন দেবদত্তা তার অনুরাগিনী হবে না কোনোদিন। দেবদত্তা তাঁর প্রতি মুগ্ধ নয়। বলপ্রয়োগে কারোর প্রতি কারোর মুগ্ধতা তৈরী করা যায় না। হায়! অস্ফুট বেদনা নিঃসরণ হলো শ্ৰেষ্ঠীর কণ্ঠ থেকে। তিনি থেমে গেছেন।

শ্রেষ্ঠী থেমে যেতেই উতঙ্ক চঞ্চল হয়ে ওঠে। তার প্রভু এই নগরের শ্রেষ্ঠ মানুষ। তিনি কিনা এক গণিকার জন্য হা-হুতাশ করেন! আবার বাণিজ্যে চলুন প্রভু। মনে মনে এই কথা উচ্চারণ করে উতঙ্ক। সে জানে বাণিজ্য যাত্রাই প্রভুকে শান্ত করতে পারে। তখন কাকে দেওয়া অলঙ্কার কার হাত দিয়ে কীভাবে ফিরে এল, কে কাকে ভালোবাসে, ভালোবাসে না--সব অবান্তর হয়ে যাবে। উতঙ্ক জানে রমণী ভোগ্যপণ্য। তার জন্য বিমর্ষ হওয়া, বিষণ্ণ হওয়া, অবসাদগ্রস্ত হওয়া অপৌরুষের লক্ষণ। ইতরজন যেমন অন্ন বস্ত্রের জন্য হা-হুতাশ করে প্রভু করছেন এক নারীর জন্য। নারী তো নারীই মাত্র। তাকে অধিকার করা কী এমন কঠিন! রাজা ধর্ষণ করে আসতে পারেন দেবদাসীকে, শ্রেষ্ঠী পারেন না বলপূর্বক অধিকার করতে ওই গণিকাকে? হলোই বা সে প্রধান গণিকা, শ্রেষ্ঠীও তো প্রধান পুরুষ। রাজা তো রাজাই, তার প্রভুর করায়ত্ত যে অতুল বৈভব।

শ্রেষ্ঠী তাঁর ভৃত্যকে কোনোদিন তার অবস্থান থেকে উপরে উঠতে দেননি। উতঙ্কর সঙ্গে কখনো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলাপ করেননি। দাস কি এসব শোনার যোগ্য? কিন্তু মনের ভিতরের ঝড় থামাতে উতঙ্ককেই অবলম্বন করলেন শ্রেষ্ঠী। তিনি জানেন উতঙ্ক আর ওই সিন্ধুদেশীয় তুরঙ্গমে কোনো তফাৎ নেই। কোনো কথাই কোথাও ছড়িয়ে যাবে না। এমন বিশ্বাসী, এমন নিষ্ঠুর দাস এই নগরে আর কোনো গৃহে নেই।

শ্রেষ্ঠী বললেন, উদ্ধববেটার এত সাহস! কীটের জীবনযাপন করত দুর্বৃত্তটা।

উতঙ্ক শুনছে। প্রভুর কথার প্রত্যুত্তর দেওয়া তার অভ্যেস নয়। এখন প্রভু তাঁর মনের ভার লাঘব করছেন। তবু উদ্ধবের নাম শুনে তপ্ত হয়ে উঠে উতঙ্ক অশ্বপৃষ্ঠে মৃদু কশাঘাত করল। বাতাসে সাঁই সাঁই শব্দ তুলল। অদৃশ্য কাকে যেন প্রহার করল সপাং সপাং শব্দে। ঘোড়া ছুটল। চাকার ঘর্ষণ তীব্র হলো। ধুলো উড়ল রথের চাকায়। উদ্ধব মরুক। কীটস্য কীট। আবার কশাঘাত করল অশ্বপৃষ্ঠে। ঘোড়া দুটি বেগবান হল। পুনঃ পুনঃ কশাঘাত করতে লাগল উতঙ্ক। তখন শ্রেষ্ঠী বললেন, ধীরে উতঙ্ক।

বেগবান অশ্বের রাশ টেনে ধরল সে। রাশ টানতেই অশ্বদুটির গতিরুদ্ধ হলো। সামনের দুটি পা তুলে চিঁহি চিঁহি রব তুলল। রথ টাল খেতেই অভিজ্ঞ সারথি উতঙ্ক ঘোড়া দুটিকে সামলে নিতে থাকে। হ্রেষাধ্বনি বন্ধ হয় না। পথের দু’পাশে মানুষজন দাঁড়িয়ে গেছে। ওই যে দাঁড়িয়ে আছে তালঢ্যাঙা, শীর্ণকায়, কৃষ্ণবর্ণের একটি মানুষ। বীট মহাপার্শ্ব ঝুঁকে পড়েছে যেন। ভীত চোখে শ্ৰেষ্ঠীর রথ দেখতে দেখতে চোখ মুছতে লাগল মানুষটা। কাকে যেন অস্ফূটস্বরে বলল, ক্ষেপেছে লোকটা, ক্ষেপেছে উতঙ্ক। ওফ্ এখন পিটিয়ে রক্ত বের করে দেবে ঘোড়া দুটোর, গর্দভ করে দেবে, দুষ্ট একদিন আমাকে মেরেছিল, উতঙ্ক ক্ষেপলে রক্ষা নেই।

পথচারী অন্যজন বলল, উতঙ্ক না, রথের ঘোড়া, এ জীব উন্মাদ হলে রক্ষা নেই।

উঁহু, উতঙ্ক, এমন আচরণ করে উতঙ্ক যেন সে উন্মাদ, উন্মাদের মতো কশাঘাত করে উন্মাদকে থামাতে কশাঘাত প্রয়োজন।

তাহলে তো উতঙ্কই কশাঘাতের যোগ্য। বীট মহাপার্শ্ব অস্ফূট গলায় বলল।

ভুল বলছ, ঘোড়া দুটি উন্মাদ, আমি উন্মাদ ঘোড়া দেখেছি, তুমি দ্যাখোনি?

উঁহু, তুমি উন্মাদ পুরুষ দ্যাখোনি।

পথচারী বলল, তুমিই দেখছি উন্মাদ ঘোড়া দেখে বুঝতে পার না।

তুমি দেখছি উতঙ্কর অনুরাগী, ওই নিষ্ঠুর দাসের দাস যেনবা। মহাপার্শ্ব বিরক্তির সঙ্গে কথাটা বলতেই পথচারী ক্ষেপে গেল। ঝপ করে তালঢ্যাঙা মহাপার্শ্বর অঙ্গবস্ত্র টেনে ধরল, তুমি এখানে কেন, গণিকালয়ে যাও।

কেন যাব, পথ কি তোমার?

লোকটি তখন বলল, চিৎকার করে উতঙ্ককে সব কহে দিচ্ছি, আগে বলো ঘোড়াই উন্মাদ, বলো বলছি।

বীটে এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, তুমি উন্মাদ।

তা শুনে পথচারী আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল মহাপার্শ্বর উপর, কী বললে তুমি দুষ্ট, আমি উন্মাদ? আমি যদি উন্মাদ হই রথের ঘোড়া পা তুলে ডাক ছাড়ে?

হই হই লেগে গেল। তখন উদ্ধব কোথায়, উদ্ধব কোথায় করতে করতে শ্রেষ্ঠীর রথ এগিয়ে গেল। শ্ৰেষ্ঠী বলছেন, যদি গম্ভীরার শিবনাথ সত্য কথা বলে থাকে তো উদ্ধব অন্যায়ই করেছে। প্রথম অন্যায়। দেবদত্তাকে দেওয়া শ্ৰেষ্ঠীর অলঙ্কার স্পর্শ করে, দ্বিতীয় অন্যায় গৃহস্থের যুবতী কন্যা অপহরণ করার, রাজ্যে কোনো ন্যায়নীতি বজায় থাকছে না, ন্যায়নীতি যত বিসর্জিত হবে, যত অনাচার হবে, রাজা পথে বসবেন।

উতঙ্ক নির্বাক। প্রভুর কথায় কথা বলা তার অভ্যাস নয়। সফল, শ্রেষ্ঠ, ধনবান পুরুষ নিজেকে সর্বোত্তম মনে করে। নিজের কথাই শেষ কথা মনে করে। নিজ সিদ্ধান্তে অবিচল থাকে। উতঙ্ক এসব জানে বলেই সে দাস শ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠীর প্রিয় দাস, ক্ষমতা তার অনেক। সে শ্ৰেষ্ঠীর কথা শুনছে চুপচাপ। রথ ধীরে ধীরে চলেছে। শ্রেষ্ঠী বলছেন, গৃহস্থের কন্যা অপহরণ হবে, ফসল লুণ্ঠন হবে, বৃষ্টিহীন দেশ জলশূন্য হবে, পথে পথে তষ্কর, দুর্বৃত্তরা ঘুরে বেড়াবে, নগর সেই পথে যাচ্ছে।

উতঙ্ক গ্রীবা বাঁকিয়ে দেখল শ্রেষ্ঠীর পায়ের কাছে অলঙ্কার ভরা রেশম পেটিকা পড়ে আছে। শ্রেষ্ঠী তা তুলেছন না। মনে খুব দুঃখ পেয়েছেন তার প্রভু। উতঙ্ক রাশ-ঝাপটা দিয়ে ঘোড়ার গতি বাড়ায়। শ্রেষ্ঠী বলছেন, রাজার শাসন না থাকলে রাজকর্মচারী দুর্বৃত্ত হয়ে দাঁড়ায়, এসবের দায় রাজারই। কন্যা অপহরণ হলে, লুণ্ঠন হলে রাজারই পাপের ভার বাড়বে, বাড়ুক, উদ্ধব যা করার করুক, উদ্ধবকে টিপে মারতে কতক্ষণ, কিন্তু রাজার দায়ভার কঠিন হয়ে উঠুক, রাজগণিকাও কিনা রাজাকে ছেড়ে রাজকর্মচারীকে অবলম্বন করেছে, এদেশ নিম্নগামিনী।

ধাবমান রথ আচমকা দাঁড়িয়ে যায়। ওই যে উদ্ধব। টাঙ্গন অশ্বের পিঠে চেপে দুলে দুলে চলেছে। উদ্ধবের মুখে গুনগুন। কী যেন সুর ভাজছে দুষ্ট? গাঁয়ের চাষা ছিল তো। সে আবার এমন চাষা যার নিজেরই জমি ছিল না এক ফোঁটা। সেই হা-ঘরের মাথায় রেশমি শিরস্ত্রাণ, গায়ে রেশমবস্ত্র, গলায় মুক্তোহার, ঘোড়ায় চেপে চলেছে সে নগর সঙ্কীর্তনে যেন বা। কিন্তু রাজকর্মচারী হোক সে যতবড়, গাঁয়ের গন্ধ তো যায়নি। তাই মেঠো গান ভাঁজছে। বেশ শোনা যাচ্ছে তার ফূর্তির কণ্ঠধ্বনি। ...পক্ক বিল্বজোড়া অতি মনোহর...কলসখানি তার চেয়ে আরো মনোহর...আহা বিল্বফলে কী যে মধু...

শ্রেষ্ঠী গর্জন করে উঠলেন, উতঙ্ক ও কোথায় যায়, কী বলে?

শ্রেষ্ঠীর গর্জন শুনেই খোলা সমেত পক্ক বিল্বফল গিলেই ফেলল উদ্ধবনারায়ণ। বেশ খুশিতেই ছিল সে। সব উধাও। লাফ দিয়ে ঘোড়া থেকে নেমে শ্ৰেষ্ঠীর অগ্নিময় চক্ষু দুটি দেখে ভীত হল। সে বলল, প্রভু ক্ষমা করবেন, চলেছি গম্ভীরা, নিজ গ্রামে, আগামী কল্য আপনার শ্রীচরণ স্পর্শ করব।

উদ্ধবের অতি বিনয়ে শ্রেষ্ঠী বিরক্ত হলেন। তিনি আবার গর্জন করলেন, উতঙ্ক, ও কেন যায় গৃহস্থের কন্যা অপহরণে?

এই কথায় উদ্ধব কুঁকড়ে যায়। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসতে লাগল। রাজার চেয়েও শ্রেষ্ঠীকে সে ডরায় বেশি। রাজার সাক্ষাৎ তার ইহজীবনে হয়নি। সামান্য সত্রী। কী করে হবে? আর এখন তো সব বিশৃঙ্খল। নগরে কত কথা উড়ছে। এখন সে প্রায় স্বাধীন রাজকর্মচারী। কোনো ন্যায় নীতির ধার ধারে না। গণিকালয়ে তার অবাধ গমন। উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী, সেনাপতি, রথাধ্যক্ষ, পণ্যাধ্যক্ষ, সুবর্ণাধ্যক্ষ, ভূমিঅধ্যক্ষ প্রভৃতিরা যেমন আচরণ করে তেমনই করতে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। বিনা পারিশ্রমিকে গণিকা ভোগ করছে, রাজার প্রাসাদ থেকে বিনামূল্যে এটা ওটা সংগ্রহ করছে, বিপণি থেকে পছন্দ মতো পণ্য তুলে নিচ্ছে--কী সুখেরই না জীবন!

উত্তর দেয় না কেন, ও অলঙ্কার পেল কোথা থেকে?

উদ্ধব ভয়ে নুয়ে গেল। তার খর্বাকার দেহ আরো খর্ব হয়ে গেল। মুখখানিতে এমনিতেই রাত্রি জাগরণ ও অমিতাচারের ছায়া ঘন। এখন তার সঙ্গে মিশেছে উদ্বেগ, দুঃশ্চিন্তা। ভীত উদ্ধবনারায়ণ বলল, প্রভু মেয়েছেলেটা সেই দুর্বৃত্ত ধ্রুবপুত্রের প্রতি...।

কথা শেষ করতে দিলেন না শ্রেষ্ঠী, বললেন, উতঙ্ক ওই চাষাটাকে আমার গৃহে আসতে বলে দে, রথ ঘোরা উতঙ্ক, অলঙ্কার কী করে পেল ও জানতে চাই।

মুহূর্তে পথ বদল করে নিল উতঙ্ক। সে জানে এবার তার কর্তব্য কী? দ্রুত ফিরে যাওয়া। প্রভু আদেশ দিয়েছেন। দ্রুত রথ ঘোরাতে লাগল উতঙ্ক। অনেকটা পথ বৃত্তাকারে পাক দিয়ে রথ ঘুরিয়ে। ঝড়ের মতো ছুটিয়ে দিল উতঙ্ক। পথের বাঁক ঘুরে তা ক্রমে অদৃশ্য।

উদ্ধব দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। সত্যি, এবার সে কী করে? যেতে হবে শ্রেষ্ঠী গৃহে। যাবে না, এমন বুকের জোর নেই উদ্ধবের। ইস্! কেন যে দেখা হলো শ্ৰেষ্ঠীর সঙ্গে? না হলে সে কী চমৎকার চলে যেতে পারত গম্ভীরা। আয়েশ করে বসত গন্ধবতীর আঙিনায়। ওই কন্যাটির জন্য সে পাগল হয়ে উঠেছে প্রায়। এখন তো তার অধিকার জন্মে গেছে। অত অলঙ্কার দিয়ে এসেছে যখন, সালঙ্কারা কন্যাটিকে পেতে কতক্ষণ? কিন্তু অলঙ্কারের কথাই যে বললেন শ্রেষ্ঠী। কী সব্বোনাশ! কীভাবে যে কী হয়ে যাচ্ছে তা জানে না সে। ঘোড়ায় না চেপে ঘোড়ার পাশে পাশে হেঁটে যাচ্ছে উদ্ধব। হাঁটতে হাঁটতে দেখল মাটিতে চিত হয়ে পড়ে আছে বীট মহাপার্শ্ব, তার বুকের উপরে এক পথচারী। উদ্ধবকে দেখে পথচারী লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল। বীটও উঠল হাসতে হাসতে, গায়ের ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে। এগিয়ে এসে মাথা নামিয়ে বলল, পয়দলে যাচ্ছেন যে সত্রী মশায়, ঘোড়ার কী হলো?

উদ্ধব তার মনের ভাব গোপন করল, পথচারীর দিকে চোখ কটমট করে তাকায়, কী ব্যাপার, পথের ভিতরে মল্লযুদ্ধ হচ্ছিল?

বীট হাসল, ছেড়ে দিন সত্ৰীমশায়, উন্মাদ, উন্মাদে কী না করে?

উদ্ধবের ধড়ে প্রাণ এসেছে যেন। বীট মহাপার্শ্ব খুব চতুর, কত ফন্দিফিকির না জানে। সে গম্ভীর হয়ে ডাকল তাকে, সঙ্গে এসো দেখি।

বীট হাত তুলল, যা উন্মাদ ঘরে যা, এরপর বন্দি হয়ে যাবি, ইনি রাজসত্রী।

পথচারী হনহন করে হেঁটে গেল। প্রায় পালিয়েই গেল যেন। এখন একটি ক্ষুদ্রাকার টাঙ্গন অশ্ব, খর্বাকার রাজসত্রী এবং অতিদীর্ঘ বীট মহাপার্শ্ব রাজপথের মধ্য দিয়ে হেঁটে চলেছে ধীরে ধীরে। উদ্ধব গলা খাঁকারি দিল।

কয়েক পা হেঁটে বীট মহাপার্শ্ব বলল, উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছে?

না, উঁহু তা হবে কেন? ঢোক গিলতে গিলতে বলল উদ্ধব।

শ্ৰেষ্ঠী আবার ঘুরে গেলেন, কেন বলুন দেখি? মহাপার্শ্ব হিসেব করে খুঁজে বের করতে চাইছিল কার্যকারণ সূত্র। শ্রেষ্ঠী ফিরে গেলেন, তারপরই দেখা যাচ্ছে ঘোড়া হাঁটিয়ে আসছে উদ্ধব। ঘোড়াটা কি খোঁড়া হয়েছে? তালঢ্যাঙা মহাপার্শ্ব নীচু হয়ে দেখল, কই নাতো। তাহলে হেঁটে আসার কারণ কী? ঘোড়া থেকে নেমেছেই বা কেন সত্ৰীমশায়? যাচ্ছেনই বা কোথায়?

উদ্ধব বলল, শ্রেষ্ঠী গৃহে।

কী ব্যাপার বলুন দেখি।

উদ্ধব বুঝতে পারছে গণিকালয়ের এই প্রহরী টের পাচ্ছে কিছু। খুব চতুর মানুষ তো। রাস্তায় মল্লযুদ্ধে মেতেছিল কেন তাও যেন ধরতে পারে উদ্ধব। পারবেই তো, কেননা সেও তো কম চতুর নয়। মাথায় কম ফন্দি খেলা করে না। উদ্ধবের মনে হলো পরামর্শ চেয়ে নেয় বীটের কাছ থেকে। মেয়েমানুষ যুবতী হোক বা বৃদ্ধা হোক, গৃহবাসী হোক আর গণিকালয়বাসী হোক মহাপার্শ্ব তাদের সব বোঝে। তখন উদ্ধব ধীরে ধীরে বলতে লাগল গন্ধবতীর কথা। না বলে উপায় নেই। এ সমস্যা ঘোড়ার কাছে বললে তো ফল মিলবে না, বুকের ভারও কমবে না, শ্রেষ্ঠীর রোষও কমবে না।

শুনতে শুনতে মহাপার্শ্ব বলল, আপনি কি কুমারী-কন্যা অপহরণ করেছেন, গম্ভীরার মেয়ে মানুষটাকে?

না তো।

করে নিয়ে আসুন গণিকালয়ে, শ্রেষ্ঠীকে আমন্ত্রণ জানান, তিনি চোখে দেখুন।

এসব কী কথা?

মহাপার্শ্ব খ্যা খ্যা করে হাসল, বলল, শ্রেষ্ঠী আপনার ভাগ্য গড়ে দিয়েছেন, শ্রেষ্ঠীকে আপনি কিছু দিতে পারবেন না? এত অকৃতজ্ঞ! শ্ৰেষ্ঠী আপনাকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে দিয়েছে, এবার যদি ঘোড়া আর উষ্ণীষ কেড়ে নেন উনি?

কথাগুলো খুব ধারালো। ক্রোধের সঞ্চার হচ্ছিল উদ্ধবের মনে। মনে হচ্ছিল বীটের পেটে গুপ্ত ছুরিকা বসিয়ে দেয়। পেট ফাঁসিয়ে নাড়িভুড়ি বের করে ফেলে রেখে যায় রাজপথে। কিন্তু কথার সত্যতা অস্বীকার করে কী করে সে?

মহাপার্শ্ব বলল, খোঁজ নিয়ে দেখুন শ্রেষ্ঠী হয়ত মেয়েছেলেটাকে দেখেছে, আর সেই কারণেই ধ্রুবপুত্রকে বিতাড়িতকরেছে নগর থেকে, বয়স হলে কচি মেয়েমানুষে ঝোঁক হয়, নিয়ে আসুন, আমাদের পাড়ায় নতুন নতুন চাই, এমন একটা হলে সেই লোভে নতুন ভ্রমর আসবে, দিনকাল খুব খারাপ, গণিকারা। সব সাজিয়ে বসে আছে, লোক নেই, বণিকরা তো আসছে না, পথে লুটপাট হচ্ছে।

হুঁ উদ্ধব অন্যকথা ভাবছিল। গন্ধবতীকে কি সত্যিই দেখেছেন শ্রেষ্ঠী? না হলে অলঙ্কারের কথা, তার কথা জানবেন কীভাবে? নিশ্চয়ই খবর এসেছে। হায়রে! কোথায় হাত দিয়েছে সে? এখন কীভাবে রক্ষা পাবে?

মহাপার্শ্ব বলল, শ্রেষ্ঠীর মন যেমন চায় তেমন কাজ করুন।

কী চায় বুঝব কীভাবে?

হে হে করে হাসল মহাপার্শ্ব, ঔষধ ওইটাই, ভোগ দিন প্রভুকে, আপনার কি মেয়েমানুষের অভাব!

কী জানি! উদ্ধব চিন্তিত মনে ঘোড়ায় উঠতে যাবে তো তাকে ধরল বীট, দাঁড়ান, কিছু অর্থ দিয়ে যান সত্ৰীমশায়।

অর্থ, কেন?

অর্থাভাবে আছি যে, খরিদ্দার নেই, পথে পথে ঘুরছি, মিলছে না উপযুক্ত লোক, আপনাকে তো পরামর্শ দিলাম বটে।

উদ্ধব কঠিন চোখে তাকায়, বলল, আমি যাচ্ছি শ্রেষ্ঠীর কাছে, বিব্রত করো না, যা বলেছি তা সত্য নয়, শ্রেষ্ঠী কি এমন মানুষ! তার আছেন প্রধানা গণিকা দেবদত্তা, তুমি তার নামে কুকথা বলো কোন সাহসে হে, গন্ধবতীকে আমি বিবাহ করব।

এক পা পিছিয়ে গেল মহাপার্শ্ব। খলই বটে উদ্ধবনারায়ণ। খল না হলে রাজসত্রী হতে পারে? সত্যিই তো তার সাহস যে সীমাহীন, রাজসত্রীর কাছে অর্থ দাবী করে? তাঁরই তো অর্থ পাওয়ার কথা মহাপার্শ্বর কাছ থেকে। কে না অর্থ যোগান দেয় সত্ৰীকে? না দিলে সমূহ বিপদ! দুটি হাত জোড় করল মহাপার্শ্ব, ঠিক আছে প্রভু আপনি যান, আসলে বড় অভাব যাচ্ছে তো, অভাবে মাথা ঠিক থাকছে না, যা বলেছি ভুল বলেছি প্রভু, ভুলে যাবেন সব।

উদ্ধব ঘোড়া ছুটিয়ে নিয়ে চলে গেল। মহাপার্শ্ব দাঁড়িয়ে থাকল কিছু সময়। তারপর মাটিতে আচমকা পদাঘাত করে বিপরীত দিকে চলতে আরম্ভ করল। আজ উদ্ধবের দিন যে খারাপ এটুকু তো জানা গেছে। বিনাশ্রমে চতুরিকার দেহটি দখল করে রাখবে সে? আজ শ্রেষ্ঠীর কাছে হাল খারাপ হবে সত্রীর। নিশ্চয়ই হবে। শ্রেষ্ঠী যেমন রেগে আছেন। নির্বোধ উদ্ধব। যা শ্রেষ্ঠীর গৃহে। থুহ্! থুতু ফেলতে ফেলতে বীট হাঁটতে লাগল। বীটকে ঠকালে কারোর রেহাই নেই। মহাকালই যা করার করবেন। শোনা যায় দেবতার রোষে গন্ধর্বদের মানবজন্ম বীট হয়ে। এই জন্মের পর আবার সে রূপবান গন্ধর্ব হয়ে যাবে। কত রূপবতী নারী তার সঙ্গিনী হবে। অপ্সরাদের নিঃশ্বাস গায়ে মেখে বসে থাকবে সর্বক্ষণ। গান গেয়ে গেয়ে অন্তরীক্ষে ভেসে বেড়াবে। আমার চেয়ে সুন্দর আর কেউ নেই মর্ত্যে অমর্ত্যে। বীট মহাপার্শ্ব হাঁটতে হাঁটতে ঝুঁকে পড়তে লাগল। খিদের জ্বালা খুব। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। একটি নিমগাছের গায়ে ঠেস দিয়ে সে দাঁড়িয়ে পড়ে ঝাপসা চোখে রাজপথে চেয়ে থাকল।

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছাব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top